মুহাম্মদ (স)-এর নবুওয়াতী জীবন-২

 

মুহাম্মদ (স)-এর নবুওয়াতী জীবন-২

পূর্ব প্রকাশের পর

কয়েকদিনের বিরতির পর সূরা মুদ্দাছছিরে নাযিলকৃত পাঁচটি আয়াতে পূর্বোক্ত অভ্রান্ত জ্ঞানের তথা তাওহীদের প্রচার ও প্রসারের গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত করা হয়েছে এক অপূর্ব অলংকারসমৃদ্ধ ভাষায়। উঠো! ভোগবাদী মানুষকে শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচাও। সর্বত্র আল্লাহর সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠা কর। শিরকী জাহেলিয়াতের কলুষময় পোষাক ঝেড়ে ফেল এবং সকল অপবিত্রতা হতে মুক্ত হও। অর্থাৎ মানুষের মনোজগতে ও কর্মজগতে আমূল সংস্কার সাধনের প্রতিজ্ঞা নিয়ে হে চাদরাবৃত মুহাম্মাদ! উঠে দাঁড়াও!!

১. হে কম্বল আবৃত (মুহাম্মাদ),

يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُدَّثِّرُ

২. (কম্বল ছেড়ে) ওঠো এবং মানুষদের (পরকালের আযাব সম্পর্কে) সাবধান করো,

قُمۡ فَأَنذِرۡ

৩. তোমার প্রতিপালকের শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো,

وَرَبَّكَ فَكَبِّرۡ

৪. আর তোমার পোশাক পবিত্র করো,

وَثِيَابَكَ فَطَهِّرۡ

৫. এবং (যাবতীয়) মলিনত ও অপবিত্রতা পরিহার করো।

وَٱلرُّجۡزَ فَٱهۡجُرۡ


এরপর একই দরদভরা ভাষায় সূরা মুযযাম্মিল নাযিল করে রাসূল (সাঃ) ও ছাহাবীগণের জন্য তাহাজ্জুদ ছালাত তথা নৈশ ইবাদতের নির্দেশ দেওয়া হয় (মুযযাম্মিল ৭৩/১-৫)। কেননা পরবর্তী সমাজ বিপ্লবের গুরুদায়িত্ব পালনের জন্য নৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি সম্পন্ন মানুষ তৈরী করাই ছিল প্রধান কাজ। আর আধ্যাত্মিক মানস গঠনে তাহাজ্জুদ ছালাতের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

১. হে বস্ত্র আচ্ছাদনকারী (মুহাম্মাদ),

يَٰٓأَيُّهَا ٱلۡمُزَّمِّلُ

২. রাতে (নামাযের জন্য) ওঠে দাঁড়াও, কিছু অংশ বাদ দিয়ে,

قُمِ ٱلَّيۡلَ إِلَّا قَلِيلٗا 

৩. তার অর্ধেক (পরিমাণ) অংশ (সালাতের জন্য দাঁড়াও), অথবা তার চাইতে আরো কিছু কম,

نِّصۡفَهُۥٓ أَوِ ٱنقُصۡ مِنۡهُ قَلِيلًا 

৪. কিংবা (চাইলে) তার ওপর (কিছু সময়) তুমি বাড়িয়েও দিতে পারো, আর তুমি কুরআন তিলাওয়াত করো থেমে থেমে,

أَوۡ زِدۡ عَلَيۡهِ وَرَتِّلِ ٱلۡقُرۡءَانَ تَرۡتِيلًا 

৫. (মনে রেখো,) অচিরেই আমি তোমার ওপর একটি ভারী (গুরুত্বপূর্ণ বাণী সদৃশ) কিছু রাখতে যাচ্ছি।

إِنَّا سَنُلۡقِي عَلَيۡكَ قَوۡلٗا ثَقِيلًا


দুনিয়াপূজারী অধঃপতিত জাতিকে উদ্ধারের যে পথ মুহাম্মাদ (সাঃ) তালাশ করছিলেন, তা তিনি পেয়ে গেলেন আল্লাহর অহি-র মাধ্যমে। আর তা হল জীবনের লক্ষ্য পরিবর্তন। অর্থাৎ দুনিয়াপূজারী মানুষকে আল্লাহমুখী করা এবং সার্বিক জীবনে অহি-র বিধান অনুসরণের মাধ্যমে আখেরাতে মুক্তিই হবে মানুষের পার্থিব জীবনের একমাত্র লক্ষ্য। অন্য কোন পথে মানবতার মুক্তি নেই।

সসীম জ্ঞানের ঊর্ধ্বে অসীম জ্ঞানের উৎস আল্লাহর সন্ধান পাওয়াই ছিল প্রথম নুযূলে অহি-র অমূল্য অবদান।

দাওয়াতী জীবন (الحياة الدعوية)

নবীদের দাওয়াতকে গোপনে ও প্রকাশ্যে দুভাগে ভাগ করার কোন সুযোগ নেই। কেননা তাঁরা নিজ সম্প্রদায়ের নিকট প্রকাশ্যভাবেই নবুঅতের দাবী নিয়ে দাওয়াত শুরু করেন। প্রত্যেক নবীই তার কওমকে বলেছেন,يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللهَ مَا لَكُمْ مِنْ إِلَهٍ غَيْرُهُ ‘হে আমার কওম! তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন উপাস্য নেই।[1] আমাদের নবীও বলেছেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنِّي رَسُولُ اللهِ إِلَيْكُمْ جَمِيعًا ‘হে মানবজাতি! আমি তোমাদের সকলের প্রতি আল্লাহর প্রেরিত রাসূল..’ (রাফ ৭/১৫৮)। তবে এটাই স্বাভাবিক যে, আপনজনদের নিকটেই প্রথমে দাওয়াত দেওয়া হয়। আর এই দাওয়াত স্থান-কাল-পাত্রভেদে কখনো গোপনে কখনো প্রকাশ্যে কখনো সর্বসমক্ষে হয়ে থাকে। ইবনু ইসহাক বিনা সনদে উল্লেখ করেন, তার নিকটে এই মর্মে খবর পৌঁছেছে যে, আল্লাহ তাকে প্রকাশ্যে দাওয়াত দেওয়ার নির্দেশ দানের আগ পর্যন্ত রাসূল (সাঃ) তিন বছর গোপনে দাওয়াত দিয়েছেন’ (ইবনু হিশাম ১/২৬২)। ইবনু সাদ এবং ওয়াক্বেদীও সে কথা বলেছেন। বালাযুরী এটাকে চার বছর বলেছেন। অনেক জীবনীকার এই মেয়াদের উপর ভিত্তি করে শেষনবী (সাঃ)-এর দাওয়াতের মেয়াদ নির্দিষ্ট করেছেন। অথচ দাওয়াতের এইরূপ সীমা নির্ধারণ করার কোন দলীল নেই’ (মা শা-আ ২৯ পৃঃ)।


যেকোন সংস্কার আন্দোলন শুরু করতে গেলে প্রথমে তা গোপনেই শুরু করতে হয়।
পুরা সমাজ যেখানে ভোগবাদিতায় ডুবে আছ,সেখানে ভোগলিপ্সাহীন আখেরাতভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার দাওয়াত নিয়ে অগ্রসর
হওয়া সাগরের স্রোত পরিবর্তনের ন্যায় কঠিন কাজ। এ পথের দিশা দেওয়া এবং এ
পথে মানুষকে ফিরিয়ে আনা দুটিই কঠিন বিষয়। রাসূলুল্লাহ (সাঃ) সেকাজের জন্যই আদিষ্ট হয়েছিলেন।
অহী প্রাপ্ত হওয়ার পরেই খাদীজার সাথে তিনি সে সময়ে মক্কার বয়োবৃদ্ধ সেরা
বিদ্বান অরাক্বা বিন নওফাল-এর কাছে যান। তিনি সবকিছু অবগত হওয়ার পর
তাঁকে ভবিষ্যৎ বিরোধিতা ও আসন্ন বিপদ সম্পর্কে সাবধান করে দেন। ফলে তিনি
প্রথমে গোপনে দাওয়াত শুরু করেন। যদিও খাদীজা, আলী, আবুবকর, ওছমান প্রমুখদের মত মক্কার সেরা ও প্রসিদ্ধ ব্যক্তিগণের ইসলাম কবুলের পর এই
দাওয়াত আদৌ গোপন থাকেনি।

[1]. রাফ ৭/৫৯, ৬৫, ৭৩, ৮৫; হূদ ১১/৫০, ৬১, ৮৪; মুমিনূন ২৩/২৩; আনকাবূত ২৯/৩৬।

{এ পোস্ট-এর ৩য় পর্ব অচেরেই দেয়া হবে ইনশা-আল্লাহ! সেই পোস্ট পেতে এই ওয়েব সাইটের ফলো বাটনে ক্লিক করে সাইটটি ফলো করে রাখুন।}

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url