কাফিরদের পরিচয় ও পরিণাম
কাফিরদের পরিচয়
ঈমান বা বিশ্বাসের বিপরীত হলো অবিশ্বাস। আর আভিধানীক অর্থে যেই অবিশ্বাসী সেই কাফির। কুরআন ও হাদীসের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঈমান থেকেই কুফরী জন্মেছে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ঈমানের নামেই কুফরী প্রচারিত হয়েছে। ইহুদী, খৃস্টান ও আরবের মুশরিকগণ মূলত আসমানী কিতাব বা ওহী এবং মনোনীত নবী-রাসূলদের অনুসারী ছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে
তারা সত্য পথ থেকে বিচ্যুত হনে এবং কুফরীতে লিপ্ত হন। এজন্য ঈমানদারদের অত্যন্ত সতর্ক থাকা দরকার এবং এ বিষয়ে ভাল জ্ঞান অর্জন করা দরকার।
কুরআন ও হাদীসের আলোকে অবিশ্বাসের প্রকাশ তিন প্রকার। যথা- (১) কুফর, (২) শিরক ও (৩) নিফাক। এই আর্টিকেলে আমরা মূলত ‘কুফর’ ও কুফরী যে
করে অর্থাৎ কাফির এর পরিচয় ও পরিনাম সম্পর্কে আলোচনা করব।
‘কুফর’ শব্দের অর্থ আবৃত করা, অবিশ্বাস করা বা অস্বীকার করা। ঈমান গ্রহণের জন্য যেসব বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করতে হয় সেগুলির কোন একটি অবিশ্বাস, সন্দেহ বা দ্বিধা করাই কুফর। রব্ব হিসেবে আল্লাহরে একত্ব, মা‘বুদ হিসেবে আল্লাহর একত্ব, রাসূলুল্লাহ্ (ছাঃ)-এর সত্যবাদিতা, নিষ্কলুষ চরিত্র, নিষ্পাপ ব্যক্তিত্ব, তাঁর নুবুওয়াতের বিশ্বজনীনতা, নবুওয়াতের সমাপ্তি, তাঁর আনুগত্য অনুকরণের
বাধ্যবাধকতা, তাঁর শিক্ষার বিশুদ্ধতা, পূর্ণতা,
অন্যান্য নবী-রাসূলের দাওয়াত বা নিষ্পাপত্ব,
আখিরাত বিষয়ক প্রমাণিত কোনো বিষয়, তাকদীরের
বিষয়ে প্রমাণিত কোনো বিষয় বা ঈমানের যে কোন প্রমাণিত বিষয় অস্বীকার, অবিশ্বাস, দ্বিধা বা সন্দেহ করলে তা কুফরী হবে এবং
যে এটা করবে সে কাফির বলে গণ্য হবে।
অনুরূপভাবে মহান আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে কোনো বিষয়ে তাঁর
সমতুল্য বা সমকক্ষ কিংবা তাঁর সাথে তুলনীয় বলে বিশ্বাস করার মাধ্যমে আল্লাহর একত্ব ও অতুলনীয়ত্ব অস্বীকার করাও কুফর। তবে এ পর্যায়ের কুফরকে ইসলামী পরিভাষায় শিরক বলা হয়।
কুরআন বা সুন্নাহ্ দ্বারা ব্যাখ্যাতীতভাবে প্রমাণিত কোন বিধান অবিশ্বাস বা অস্বীকার করা কুফরী। সালাত, যাকাত, সিয়াম ইত্যাদির ফরজ হওয়া অস্বীকার করা, ব্যভিচার, চুরি, হত্যা ইত্যাদির হারাম হওয়া অস্বীকার করা, সালাতের তাহারাত, রাক‘আত, সময়, রুকু, সাজদা, ইত্যাদির পদ্ধতি অস্বীকার বা ব্যতিক্রম করা এ পর্যায়ের কুফরী। তবে ইজতিহাদী
বা ইখতিলাফী বিষয় অস্বীকার করলে তা কুফর বলে গণ্য হবে না। ইসলামী কোন যে কোন
বিধানের প্রতি অসন্তুষ্ট থাকাও কুফরী। যেমন আল্লাহর নাযিলকৃত কোন বিষয়কে অপছন্দ করা,
ইসলামের বিধান বলে সুনিশ্চিতভাবে প্রমাণিত কোনো কিছুর প্রতি বিরক্তি বা ঘৃণা পোষণ
করা, ইসলামের কোন নির্দেশ বা শিক্ষা অচল, সেকেলে বা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করা কুফর।
অনুরূপভাবে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা বৈধ মনে করা কুফর। যদি কেউ আল্লাহর নির্দেশ অমান্য করা পাপ ও অন্যায় জেনেও প্রবৃত্তি বা শয়তানের প্ররোচনায় বা জাগতিক কোনো
স্বার্থে আল্লাহর বিধান অমান্য করে, আল্লাহর বিধানের বিপরীতে চলে, চালায় বা বিধান দেয় সে পাপী বলে গণ্য। কিন্তু কেউ যদি মনে করে ‘মারিফত’ হাসিল হয়ে যাওয়ার কারণে
কোনো ব্যক্তির জন্য আল্লাহর বিধান বা শরীয়তের ব্যতিক্রম করা বৈধ, অথবা মনে করে যে, যুগের প্রেক্ষাপটে ইসলামের অমুক বিধানটি মানা জরুরী নয় বা কুরআনের অমুক
নির্দেশনাটি আর কার্যকর নয়, অথবা কুরআনের নির্দেশের বিপরীত চলা, চলানো বা বিধান দেওয়াতে কোনো অসুবিধা নেই মনে করে তবে সে ব্যক্তি কাফির বলে গণ্য হবে। কারণ আল্লাহর একটি নির্দেশ অপছন্দ করাও কুফরী।
এ মর্মে মহান আল্লাহ সূরা মুহাম্মদ-এর ৮ ও ৯ আয়াতে বলেন:
وَالَّذِيْنَ كَفَرُوا فَتَعْسًا لَهُمْ وَأضَلَّ أَعْمَالَهُمْ ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ كَرِهُوا مَا أَنْزَلَ اللهُ فَأحْبَطَ أَعْمَالَهُمْ.
“যারা কুফরী করেছে তাদের জন্য রয়েছে দুর্ভোগ এবং তিনি তাদের কর্ম ব্যর্থ করে দিবেন। তা এজন্য যে, আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেছেন তারা তা অপছন্দ করে। সুতরাং আল্লাহ্ তাদের কর্ম নিষ্ফল করে দিবেন।”
এ ব্যাপারে সূরা মায়িদা-এর ৪৪ নং আয়াতে বলা হয়েছে:
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ.
“আল্লাহ্ যা অবতীর্ণ করেছেন তদনুসারে যারা বিধান দেয় না
তারাই কাফির।”
অনুরূপভাবে ইসলামের কোন প্রমাণিত বিষয় নিয়ে হাসি-তামাশা বা উপহাস
করা অথবা যারা এরূপ করে তাদের সাথে অবস্থান করা বা তাদের সাথে আন্তরিক সম্পর্ক
রাখাও কুফরী করার শামিল। মহান আল্লাহ্ এ
ব্যাপারে সূরা আন‘আমের ৬৮ নং আয়াতে ইরশাদ করেন:
وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِيْنَ يَخُوْضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى
يَخُوضُو فِي حَدِيْثِ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا
تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقومِ الظَّالِمِينِ.
“তুমি যখন দেখ, তারা আমার আয়াত
সম্বন্ধে উপহাসমূলক আলোচনায় মগ্ন তখন তুমি দূরে সড়ে পড়বে, যে পর্যন্ত না
তারা অন্য প্রসঙ্গে প্রবৃত্ত হয় এবং শয়তান যদি তোমাকে ভ্রমে ফেলে তবে স্মরণ হওয়ার
পরে জালিম সম্প্রদায়ের সাথে বসবে না।”
কাফিরদের পরিণাম
কাফিরদের শেষ পরিনাম বা পরিণতি খুবই ভয়াবহ। তারাও কিন্তু
আদি পিতা-মাতা
আদমেরই (আ) সন্তান। সেকারণে তারাও
আমাদের ভাই। সুতরাং তাদের
জন্য জন্য আমাদেরকে অবশ্যই ভাবতে হবে। ওরা আমাদের কুরআন-হাদীস বিশ্বাস করে না,
তাই বলে ওদেরকে দূরে ঠেলে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং আমাদের উচিত ওদেরকেও
বারবার বুঝানো, বারবার সতর্ক-সাবধান
করা। যাতে ওরা অন্তত এতটুকু বুঝে যে, ওরা যে পথে বা যে মতে
জীবন যাপন করছে তা সঠিক নয়। কারণ মহান আল্লাহ সূরা আলে ইমরানের ১৯ নং আয়াতে স্পষ্ট
করে বলেছেন: إِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللهِ الإسلَام অর্থাৎ, ইসলামই আল্লাহর
নিকট একমাত্র দীন।
বিশ্বের কাফির তথা অমুসলিম ভাই-বোনেরা! উল্লেখিত আয়াতটি পড়ে বা
জেনে আপনি কি একটু ভেবে দেখবেন? বুঝলাম, আপনি আমাদের কুরআন বিশ্বাস করেন না কিংবা আপনি এর বাণীগুলো মিথ্যা মনে
করেন। কিন্তু এর বিপরতটা একবার চিন্তা করেছেন? অর্থাৎ,
বিষয়টি যদি সত্যি হয় তখন আপনার কি হবে? ….
এখানেই শেষ নয়। মহাগ্রন্থ আল্ কুরআনের সূরা আলে ইমরানের ৮৫
নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ আরো ইরশাদ করেন: “কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দীন (জীবন বিধান) গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনো কবুল (গ্রহণ)
করা হবে না এবং পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভূক্ত।
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন,
ولا تموتن إلا وأنتم مسلمون
অর্থাৎ,“ মুসলিম না হয়ে মুত্য বরণ করিও না।” (সূরা আলে ইমরান, আয়াত-১০২)
ইসলাম গ্রহণ তথা মহান আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা যে কত
বেশি প্রয়োজন এখান থেকেই তা বুঝে নিতে পারেন। আর যদি এটা আপনার নিকট মিথ্যা মনে হয় তবে একে মিথ্যা মনে
করার পরিণাম জেনে নিন এবং তা গ্রহণ করতে প্রস্তুত থাকুন।
মহাগ্রন্থ আল্ কুরআনের সূরা আ‘রাফের ৪০ নং আয়াতে মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন: “নিশ্চয় যারা আমার আয়াতকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করে এবং অহংকার বশতঃ তা থেকে ফিরে থাকে, তাদের জন্য আকাশের দ্বার উন্মুক্ত করা হবে না এবং জান্নাতেও প্রবেশ করবেনা, যতক্ষণ না সূঁচের ছিদ্র পথে উষ্ট্র প্রবেশ করে, এমনিভাবেই আমি অপরাধীদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।”
অর্থাৎ, সূঁচের ছিদ্র দিয়ে উষ্ট্র বা উট প্রবেশ করা যেমন অসম্ভব, আল্লাহ্ ও তাঁর বানীর প্রতি অবিশ্বাস তথা মিথ্যাপ্রতিপন্নকারীর জান্নাতে প্রবেশ করাও তেমনি অসম্ভব।
তাহলে তারা কোথায় থাকবে? তাদের আবাসস্থল সম্পর্কে এর পরের আয়াত তথা সূরা আরাফের ৪১ নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ বলেন: “তাদের জন্য হবে জাহান্নামের
(আগুন) শয্যা এবং তাদের উপরের আচ্ছাদনও হবে (আগুনের তৈরী) চাদর, এমনিভাবেই আমি যালিমদেরকে প্রতিফল দিয়ে থাকি।”
পক্ষান্তরে আপনি যদি ঈমান গ্রহণ করেন এবং ইসলামিক লাইফ স্টাইল মেনে চলেন তবে আপনার জন্য অনেক সুসংবাদ এর পরের আয়াতেই আল্লাহ দিয়েছেন।
মহান আল্লাহ বলেন: “যারা ঈমান এনেছে ও ভাল কাজ করেছে এমন কোন ব্যক্তিকে আমি তার সাধ্যাতীত দায়িত্ব অর্পণ করিনা। তারাই হবে জান্নাতবাসী, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।”
মহান আল্লাহ্ সকলকে ঈমান গ্রহণের তৌফিক দিন এবং ঈমানের সাথেই
মৃত্যু দান করুন। আ-মী-ন।
Visit Our English Site : Click Here
Thanks for reading. جزاك الله خيرا
