শিরকের পরিচয় ও কারণ
শিরক অর্থ অংশীদার হওয়া, অংশীদার করা বা সহযোগী বানানো।
কুরআনের ভাষায় শিরক হলো কাউকে আল্লাহর সমতুল্য, সমকক্ষ বা তুলনীয় বলে মনে করা।
মহান আল্লাহ বলেন:
فَلَا تَجْعَلُوْا لِلَّهِ أَنْدَادًا وَّأَنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ.
অর্থ- অতএব তোমরা জেনেশুনে কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ বানাবে না। (সূরা বাক্বারা, আয়াত ২২)
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ)বলেন:
سَأَلْتُ رَسُوْلُ اللهِ صـ. أَيُّ الذَّنْبُ عِنْدَ اللهِ أَكْبَرُ؟ قَالَ: أَنْ تَجْعَلَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ.
অর্থ- আমি রাসূল (ছাঃ) কে প্রশ্ন করলাম,
আল্লাহর নিকট সবচেয়ে কঠিন পাপ কী? তিনি বলেন, সবচেয়ে কঠিন পাপ এই যে, তুমি আল্লাহর
সমকক্ষ বানাবে অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন। (ছহীহ্
বুখারী, হা. ৪/১৬২৬)
শিরক কাকে বলে? আল্লাহর কোনো ক্ষমতায়, গুণে বা ইবাদতে অন্য
কাউকে অংশীদার করাই শিরক। বিশ্ব সৃষ্টি, পরিচালনা, জীবনদান, মৃত্যুদান, বৃষ্টিদান,
অলৌকিক সাহায্য, কল্যাণ, অকল্যাণ ইত্যাদি সকল ক্ষমতা আল্লাহর। অন্য কারো এরূপ
ক্ষমতা বা অধিকার আছে বলে বিশ্বাস করা শিরক। অনুরূপভাবে আল্লাহর মহান গুণাবলীর
মধ্যে রয়েছে তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বদ্রষ্টা, সর্বশ্রোতা, অদৃশ্য, জ্ঞানের মালিক।
অন্য কারো এরূপ গুণ আছে বলে মনে করা শিরক। অনুরূপভাবে সাজ্দা, দোয়া মানত, জবাই,
তাওয়াক্কুল, ভরসা, নির্ভরতা, অলৌকিক ভয়, আশা ইত্যাদি সকল ইবাদত একমাত্র আল্লাহর
জন্য। অন্য কারো জন্য এগুলি করাই হলো শিরক তথা অংশ দেওয়া বা অংশিদার বানানো।
এখানে আমাদের মনে হতে পারে, আমরা তো মুসলিম, আমাদের তো শিরক
এর কোন ভয় নেই। বেঈমানগণ শিরক বা কুফরীতে লিপ্ত। মুমিন তো শিরক থেকে মুক্ত। কিন্তু
কুরআন কারীমে বলা হয়েছে যে, অধিকাংশ ঈমানদারই শিরক-এর মধ্যে লিপ্ত।
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেন:
وَمَا يُؤْمِنُ أَكْثَرُ هُمْ بِاللهِ إِلَّا وَهُمْ
مُشْرِكُوْنَ.
অধিকাংশ মানুষ আল্লাহর উপর ঈমান আনয়ন করে এবং সেই অবস্থায় তারা
শিরকে লিপ্ত থাকে। (সূরা ইউসুফ, আয়াত ১০৬)
শিরকের কারণ ও ধরণ
শিরকের কারণ ও ধরণ বর্ণনা করে মহান আল্লাহ্ ইরশাদ করেন,“আর
যারা আল্লাহ্ ছাড়া অন্যান্য আউলিয়া (অভিভাবক বা বন্ধু) গ্রহণ করেছে তারা বলে, আমরা
তো এদের শুধু এজন্যই ইবাদত করি যে এরা আমাদেরকে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেবেন।
যে মিথ্যাবাদী কাফির আল্লাহ তাকে সৎপথে পরিচালিত করেন না।” (সূরা যুমার, আয়াত ৩ )
অন্য আয়াতে আল্লাহ বলেন, “তারা আল্লাহ্ ব্যতীত যাদের ইবাদত
করে তারা তাদের কোনো ক্ষতিও করতে পারে না, উপকারও করতে পারে না। তারা বলে এর
আল্লাহর কাছে সুপারিশকারী (শাফায়াতকারী)। বল, তোমরা কি আল্লাহকে আমন কিছু জানাচ্ছ
যা তিনি জানেন না আকাশ মন্ডলী ও পৃথিবীর মধ্যে? সুবহানাল্লাহ্! তিনি সুমহান,
সুপবিত্র এবং তোমাদের শিরক থেকে তিনি উর্দ্ধে।” (সূরা ইউনুস, আয়াত ১৮)
মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন, “আল্লাহ্ কি তাঁর বান্দার জন্য
যথেষ্ট নন? অথচ তারা তোমাকে আল্লাহর পরিবর্তে যারা তাদের ভয় দেখায়। আল্লাহ যাকে
বিভ্রান্ত করেন তার জন্য কোনো পথ-প্রদর্শক নেই। এবং আল্লাহ্ যাকে হিদায়াত করেন তার
জন্য কোন পথভ্রষ্টকারী নেই। আল্লাহ্ কি পরাক্রমশালী, দন্ডবিধায়ক নন? তুমি যদি
তাদেরকে জিজ্ঞাসা কর, আকাশমন্ডলী ও পৃথিবী কে সৃষ্টি করেছেন? তারা অবশ্যই বলবে, ‘আল্লাহ্’।
তুমি বল, তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ্ আমার অনিষ্ট করতে চাইলে তোমরা আল্লাহর
পরিবর্তে যাদেরকে ডাক তারা কি সে অনিষ্ট দূর করতে পারবে? অথবা তিনি আমার প্রতি
অনুগ্রহ করতে চাইলে তারা কি সে অনুগ্রহ রোধ করতে পারবে? বল, আমার জন্য আল্লাহই
যথেষ্ট। নির্ভরকারীগণ আল্লাহর উপরেই নির্ভর করে।“ (সূরা যুমার, আয়াত ৩৬-৩৮)
এ ব্যাপারে মহান আল্লাহ আরো ইরশাদ করেন, “বল, তোমরা কি
আল্লাহ্ ছাড়া এমন কারো ইবাদত করছ যে তোমাদের জন্য কোন প্রকারের ক্ষতির মালিক নয়
এবং কোনো প্রকার উপকারেরও মালিক নয়? আর আল্লাহ্ সবৃ-শ্রোতা এবং সর্ব-জ্ঞানী।” (সূরা মায়েদা , আয়াত
৭৬)
মহান বলেন, “তিনি (আল্লাহ্) ব্যতীত তাদের কোন অভিভাবক নেই
এবং কোনো সুপারিশকারীও নেই।” (সূরা আন‘আম, আয়াত ৫১)
এ মর্মে মহান আল্লাহ্ আরো বলেন,“বল, সকল শাফাআত-সুপারিশ
আল্লাহরই ইখতিয়ারে, তাঁরই মালিকানা।” (সূরা যুমার, আয়াত ৪৪)
এ মর্মে মহান আল্লাহ্ আরো বলেন,“যাকে অনুমতি দেয়া হয় সে
ব্যতীত আল্লাহর নিকট কারো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না।” (সূরা সাবা, আয়াত ২৩ )
এ মর্মে মহান আল্লাহ্ আরো বলেন,“তিনি যাদের প্রতি সন্তুষ্ট
তাদের ছাড়া আর কারো জন্য তারা সুপারিশ করে না।” (সূরা
আম্বিয়া, আয়াত ২৮)
এ মর্মে মহান আল্লাহ্ আরো বলেন,“আকাশে কত ফিরিশতা রয়েছে।
তাদের কোনো সুপারিশ ফলপ্রসূ হবে না যতক্ষণ আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা এবং যার প্রতি
সন্তুষ্ট তাকে অনুমতি না দেন।” (সূরা নাজম, আয়াত ২৬)
মহান আল্লাহ্ সর্বজ্ঞানী, সর্বজান্তা। সুতরাং, তাঁকে ফাঁকি
দিয়ে, তাঁর সাথে কাউকে জড়িয়ে (শিরক করে) কিংবা তাঁর সাথে কাউকে তুলনা করে কেউ
এটিকে সঠিক কাজ মনে করতে পারে না, বরং এটি অবশ্যই ভুল এবং নিকৃষ্ট কাজ। এ মর্মে
মহান আল্লাহ্ বলেন,“সুতরাং তোমরা আল্লাহর জন্য কোনো তুলনা-উদাহরণ স্থাপন করো না।
আল্লাহ্ জানেন এবং তোমরা জান না।” (সূরা নাহল, আয়াত ৭৪)
উপরোক্ত দলীলসমূহ হতে সহজেই প্রতিয়মান হয় যে, মহান আল্লাহর
সাথে শিরক তথা অংশিদার স্থাপন করা এক মহা অন্যায় এবং অমার্জনীয় অপরাধ। মহান বলেন, إِنَّ
الشِّرْكَ لَظُلْمٌ عَظِيمٌ “নিশ্চয়ই শিরক মহা জুলম (অন্যায়)। (সূরা লুকমান)। সুতরাং, বিশ্বের সকল ধর্ম, বর্ণ, জাতি-গোষ্ঠী নির্বিশেষে সব মতবাদের বিশ্বাসী বা অনুসারী মানবের অচিত শিরক থেকে বিরত থাকা এবং জাহান্নাম থেকে বাঁচার চেষ্টা করা। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে তৌফিক দান করুন। আ-মী-ন।
Visit Our English Site : Click Here
Thanks for reading. جزاك الله خيرا