বান্দার হক ও মানবাধিকার
আল্লাহ যা কিছু বিধানাবলী প্রদান করেছেন তা তাঁর নিজের জন্য নয়, সবই মানুষের কল্যাণের জন্য। এ সকল বিধান দুই প্রকার। যথাঃ (১) হক্কুল্লা বা আল্লাহর অধিকার সংক্রান্ত বিধান এর্ং (২) হক্কুল ইবাদ বা বান্দার অধিকার সংক্রান্ত বিধান।
(১) প্রথম প্রকার বিধান মানুষের ব্যক্তিগত কল্যাণ ও উন্নতির জন্য। যেমন, সালাত, সাওম, হজ্ব, যিকির ইত্যাদি নির্দেশিত কর্মে অবহেলা করা অথবা ব্যভিচার, মদপান ইত্যাদি নিষিদ্ধ কর্মে লিপ্ত হওয়া। এগুলি লঙ্ঘন করলে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হয়। এগুলিকে হক্কুল্লা বা আল্লাহর অধিকার বলা হয়।
(২) দ্বিতীয় প্রকার বিধান অন্যান্য সৃষ্টি বা অন্যান্য মানুষের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য। এগুলি লঙ্ঘন করলে আল্লাহর বিধান অমান্য করা ছাড়াও আশেপাশের কোনো সৃষ্টি বা মানুষের ক্ষতি হয়। এগুলিকে হক্কুল ইবাদ বা সৃষ্টিজগতের অধিকার বলা হয়। অর্থাৎ এগুলিতে আল্লাহর হক্ক ছাড়াও বান্দার হক্ক জড়িত। কারো প্রাপ্য না দেওয়া, কাউকে গালি, গীবত ইত্যাদির মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া, কারো সম্পদ, অর্থ, সম্মান বা জীবনের কোনো প্রকার ক্ষতি সাধন করা। ফাঁকি, ধোকা, সূদ, ঘুষ, জুলুম, খুন, ধর্ষণ, সবাই এই জাতীয় পাপ। কেউ যদি অন্য কাউকে প্ররোচিত করে তাহলে তাও এই প্রকারের পাপে পরিণত হবে। এছাড়া আল্লাহ্ ও তাঁর মহান রাসূল ﷺ সমাজের মানুষের প্রতি অন্য মানুষের কিছু দায়িত্ব নির্ধারিত করেছেন। স্বামীর প্রতি দায়িত্ব, স্ত্রীর প্রতি দায়িত্ব, পিতামাতার প্রতি দায়িত্ব, সন্তানের প্রতি দায়িত্ব, প্রতিবেশীর প্রতি দায়িত্ব, কর্মচারীর দায়িত্ব, সহকর্মীর দায়িত্ব, দরিদ্রের প্রতি দায়িত্ব। এগুলি পূর্লভাবে পালন না করলে তা হক্কুল ইবাদ বা সৃষ্টির অধিকার নষ্টের পাপ হবে।
প্রথম প্রকারের পাপের জন্য আল্লাহ্ ক্ষমা প্রার্থনা করলে আল্লাহ্ তা ক্ষমা করবেন বলে কুরআন ও হাদীসে বারংবার সুসংবাদ প্রদান করা হয়েছে। অপরদিকে দ্বিতীয় প্রকারের পাপের মধ্যে দুইটি দিক রয়েছে: প্রথমত, আল্লাহর বিধানের অবমাননা এবং দ্বিতীয়ত, আল্লাহর কোনো সৃষ্টির অধিকার নষ্ট করা। এ সকল পাপ থেকে বান্দা যখ আন্তুরিকতার সাথে অনুতপ্ত হয়ে ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা করে তখন আল্লাহ্ তাঁর বিধান অবমাননার দিকটি ক্ষমা করতে পারেন। কিন্তু চূড়ান্ত বিচার দিনের মহান ন্যায়বিচারক তাঁর কোনো সৃষ্টির প্রাপ্য ক্ষমা করেন না।তার পাওনা তিনি বুঝে নেবেন ও তাকে বুঝে দেবেন। এজন্য এই জাতীয় পাপের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ, যাদের অধিকার নষ্ট বা সংকুচিত হয়েছে তাদের নিকট থেকে অধিকার বুঝিয়ে দিয়ে ক্ষমা না নিলে আল্লাহ্ ক্ষমা করবেন না।
এজন্য কুরআন ও হাদীসে বান্দার হক্কের বিষয়ে অত্যন্ত বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। আমাদের চারিপার্শে অবস্থানরত আল্লাহর অন্যান্য সৃষ্টিকে কুরআন-হাদীসের আলোকে কয়েকটি পর্যায়ে ভাগ করতে পারি। যথা-
(১) সাাধারণভাবে সকল সৃষ্টির অধিকার,
(২) সকল মানুষের অধিকার,
(৩) সকল মুসলিমের অধিকার এবং
(৪) দায়িত্বাধীনদের ও পরিবারের সদস্যদের অধিকার।
সকল প্রাণী ও সৃষ্টির প্রতি মুমিনের দায়িত্ব হলো কষ্টপ্রদান ও ক্ষতি থেকে বিরত থাকা। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এ বিষয়ে নির্দেশনা প্রদান করেছেন। যেমন, সহীহুত তারগীব (১/২৬৫) কিতাবে বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন, “যদি কোনো মানুষ একটি চড়ই পাখী বা তার চেয়ে বড় কিছু না-হক্ক ভাবে (অর্থাৎ, জবাই করে খাওয়ার জন্য ছাড়া) হত্যা করে তবে তাকে ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ্ এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করবেন।”
ছহীহ্ বুখারী ২/৮৩৪ নং হাদীসে রাসূল ﷺ বলেন,
دَخَلَتْ امْرَاةٌ النَّارَ فِي هِرَةٍ رَبَطَتْهَا فَلَمْ تُطْعِمْهَا تَأكُلُ مِنْ خَشَاشِ الأَرْضِ.
“একটি বিড়ালের কারণে একজন মহিলা জাহান্নামে যায়। সে বিড়ালটিকে বেঁধে রেখেছিল, অথচ তাকে খাদ্য দেয় নি। আবার বাইরের পোকমাকড় খাওয়ার জন্য তাকে ছেড়েও দেয় নি।”
ইসলামই সর্বপ্রথম জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সমান বলে ঘোষণা করেছে এবং মুমিনগণকে নির্দেশ দিয়েছে সকলের অধিকার বুঝে দিতে। বিশেষত প্রতিবেশী, সহকর্মী, এতিম, শ্রমিক, ক্রেতা বা অনুরূপ যারা আপনার চারিপার্শে থাকে তাদের প্রতি অন্যায় হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি। এজন্য কুরআন-হাদীসে এদের বিষয়ে বেশি বলা হয়েছে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে এদের সকলের প্রতি মুমিনের দায়িত্ব হলো-
(১) সবার সাথে সাধ্যমত ভাল ব্যবহার করতে হবে এবং সাধ্যমত উপকার করতে হবে।
(২) কোনোভাবে কারো প্রাপ্য বা পাওনা নষ্ট করা যাবে না বা কম দেওয়া যাবে না।
(৩) কোনোভাবে কাউকে কষ্ট দেওয়া যাবে না এবং
(৪) সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে।
এমর্মে সূরা নিসা-এর ৩৬ নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ বলেন,
وَٱعۡبُدُواْ ٱللَّهَ وَلَا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗا وَبِذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡيَتَٰمَىٰ وَٱلۡمَسَٰكِينِ وَٱلۡجَارِ ذِي ٱلۡقُرۡبَىٰ وَٱلۡجَارِ ٱلۡجُنُبِ وَٱلصَّاحِبِ بِٱلۡجَنۢبِ وَٱبۡنِ ٱلسَّبِيلِ وَمَا مَلَكَتۡ أَيۡمَٰنُكُمۡۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يُحِبُّ مَن كَانَ مُخۡتَالٗا فَخُورًا۞
“তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর ও তার সাথে কোনো শরীক করো না এবং পিতামাতা, আত্মীয়-স্বজন, এতিম,অভাবগ্রস্ত,নিকট প্রতিবেশী, দূর-প্রতিবেশী, সাথী-সহকর্মী, পথচারী এবং তোমাদের অধিকারভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে সদ্ব্যবহার কর। নিশ্চয় আল্লাহ দাম্ভিক ও আত্মগরবীকে পছন্দ করেন না।”
সূরা আনআম-এর ১৫১-১৫২ নং আয়াতে মহান আল্লাহ্ বলেন,
قُلۡ تَعَالَوۡاْ أَتۡلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمۡ عَلَيۡكُمۡۖ أَلَّا تُشۡرِكُواْ بِهِۦ شَيۡٔٗاۖ وَبِٱلۡوَٰلِدَيۡنِ إِحۡسَٰنٗاۖ وَلَا تَقۡتُلُوٓاْ أَوۡلَٰدَكُم مِّنۡ إِمۡلَٰقٖ نَّحۡنُ نَرۡزُقُكُمۡ وَإِيَّاهُمۡۖ وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلۡفَوَٰحِشَ مَا ظَهَرَ مِنۡهَا وَمَا بَطَنَۖ وَلَا تَقۡتُلُواْ ٱلنَّفۡسَ ٱلَّتِي حَرَّمَ ٱللَّهُ إِلَّا بِٱلۡحَقِّۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَعۡقِلُونَ۞ وَلَا تَقۡرَبُواْ مَالَ ٱلۡيَتِيمِ إِلَّا بِٱلَّتِي هِيَ أَحۡسَنُ حَتَّىٰ يَبۡلُغَ أَشُدَّهُۥۚ وَأَوۡفُواْ ٱلۡكَيۡلَ وَٱلۡمِيزَانَ بِٱلۡقِسۡطِۖ لَا نُكَلِّفُ نَفۡسًا إِلَّا وُسۡعَهَاۖ وَإِذَا قُلۡتُمۡ فَٱعۡدِلُواْ وَلَوۡ كَانَ ذَا قُرۡبَىٰۖ وَبِعَهۡدِ ٱللَّهِ أَوۡفُواْۚ ذَٰلِكُمۡ وَصَّىٰكُم بِهِۦ لَعَلَّكُمۡ تَذَكَّرُونَ۞
“বল, এসো, তোমাদের রব তোমাদের জন্য যা নিষিদ্ধ করেছেন তা তোমাদের পড়ে শুনাই। তা এই যে, তোমরা তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না,পিতামাতার প্রতি সদ্ব্যবহার করবে, দারিদ্র্যের জন্য তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না, আমিই তোমাদের ও তাদের রিযক প্রদান করি, প্রকাশ্য বা অপ্রকাশ্য কোনো প্রকার অশ্লীলতার কাছেও যাবে না, আল্লাহ যে প্রাণকে সম্মানিত-নিষিদ্ধ করেছেন তাকে আইনগত কারণ ছাড়া হত্যা করবে না। তোমাদেরকে তিনি এরূপ নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা অনুধাবন কর। এতিমের সম্পদের কাছেও যাবে না, কেবলমাত্র বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়া পর্যন্ত তার রক্ষণাবেক্ষণের পয়োজন ছাড়া এবং পরিমাপ ও ওযন ন্যায়ভাবে পুরোপুরি দিবে, আমি কাউকে তার সাধ্যতীত ভার অর্পন করি না, যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ন্যায় ও ইনসাফের সাথে কথা বলবে, তা যদি স্বজনের বিষয়েও হয় এবং আল্লাহকে প্রদত্ত অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। আল্লাহ্ তোমাদেরকে এ নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ করতে পার।”
সূরা মায়িদা-এর ৮ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন,
يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ كُونُواْ قَوَّٰمِينَ لِلَّهِ شُهَدَآءَ بِٱلۡقِسۡطِۖ وَلَا يَجۡرِمَنَّكُمۡ شَنََٔانُ قَوۡمٍ عَلَىٰٓ أَلَّا تَعۡدِلُواْۚ ٱعۡدِلُواْ هُوَ أَقۡرَبُ لِلتَّقۡوَىٰۖ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَۚ إِنَّ ٱللَّهَ خَبِيرُۢ بِمَا تَعۡمَلُونَ۞
“হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর জন্য ন্যায় সাক্ষ্য দানে অবিচল থাকবে, কোনো সম্প্রেদায়ের প্রতি বিদ্বেষ-শত্রুতা তোমাদেরকে যেন কখনো সুবিচার বর্জনে প্ররোচিত না করে। তোমরা সুবিচার কর, এটা তাকওয়ার অতি নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমরা যা করো তা ভালোভাবে জানেন।
এ আয়াতে ও অন্যান্য আয়াতে আল্লাহ্ সুস্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন যে, মুসলিমদের শত্রু কাফিরগণের ক্ষেত্রেও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। বিভিন্ন হাদীসে রাসূলুল্লাহ্ ﷺ মুসলিম সমাজে বসবাসরত অমুসলিম সংখ্যালঘুদের অধিকার সংরক্ষণের নির্দেশ দিয়েছেন। পূর্ববর্তী খুতবায় হারাম উপার্জন প্রসঙ্গে আমরা দেখেছি যে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেন, “অমুসলিম নাগরিককে কোনোভাবে কষ্ট দিলে বা জুলুম করলে তিনি স্বয়ং তার বিপক্ষে বাদী হবেন।”
সহীহ্ বুখারী ৬/২৫৩৩ নং হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন,
“যদি কেউ কোনো অমুসলিম নাগরিক বা আগন্তুককে হত্যা করে তবে সে জান্নাতের সুগন্ধও পাবে না, যদিও জান্নাতের সুগন্ধ চল্লিশ বৎসরের দূরুত্ব থেকে পাওয়া যায়।”
ধর্মবর্ণ নিবিশেষে কোনো মানুষকে কষ্ট না দেওয়া জান্নাত লাভের অন্যতম শর্ত। রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি হালাল খাদ্য খেয়ে জীবনযাপন করবে, সুন্নাত অনুসারে আমল করবে এবং কোনো মানুষ তাঁর দ্বারা কষ্ট পাবে না, সে ব্যক্তি জান্নাতী হবে।” (সুনানে তিরমিযী ৪/৬৬৯)
সহীহ্ বুখারী (৫/২২৪০) ও সহীহ্ মুসলিম (১/৬৮) বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, “আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়, আল্লাহর কসম সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! আল্লাহর কসম, সে মুমিন নয়! সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ ﷺ, সে ব্যক্তি কে? তিনি বলেন, যার প্রতিবেশী-পার্শবর্তী মানুষ তার কষ্ট থেকে রেহাই পায় না।”
সহীহুত তারগীব (২/৩৪৫) কিতাবে সহীহ্সূত্রে বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি পরিতৃপ্ত-ভরপেট থাকে অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে সে মুমিন নয়।” অন্য বর্ণনায়, “যে পরিতৃপ্ত হয়ে রাত্রিযাপন করে, অথচ তার প্রতিবেশী ক্ষুধার্ত থাকে এবং সে তা জানে সে মুমিন নয়।”
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলে, অমুক মহিলা খুব বেশি সালাত ও সিয়াম পালন করে এবং দান করে, কিন্তু সে তার মুখ দ্বারা তার প্রতিবেশিনীদেরকে কষ্ট দেয়। তিনি বলেন, মহিলাটি জাহান্নামী। আরেক মহিলা সম্পর্কে বলা হয় যে, তার নফল ইবাদত- সালাত, সিয়াম, দান ইত্যাদি সামান্য, তবে সে তার মুখ দিয়ে দ্বারা প্রতিবেশিনীদেরকে কষ্ট দেয় না। তখন তিনি বলেন, এ মহিলা জান্নাতী। (সহীহুত তারগীব ২/৩৪৫, সনদ সহীহ্)
আল কুরআন ও সহীহ্ হাদীসসমূহে মানবাধিকার সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। বিশেষত, এতিম-অসহায়দের ব্যাপারে।
এমর্মে সূরা নিসার ১০ নং আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
إِنَّ ٱلَّذِينَ يَأۡكُلُونَ أَمۡوَٰلَ ٱلۡيَتَٰمَىٰ ظُلۡمًا إِنَّمَا يَأۡكُلُونَ فِي بُطُونِهِمۡ نَارٗاۖ وَسَيَصۡلَوۡنَ سَعِيرٗا۞
“যারা অন্যায়ভাবে এতিমদের সম্পদ ভক্ষণ করে তারা তাদের উদরে অগ্নি ভক্ষণ করে এবং তারা জাহান্নামের জলন্ত আগুনে জ্বলবে।”
এতিমরা সবচেয়ে বেশি অত্যাচারিত হয় তাদের অভিভাবক আত্মীয়দের দ্বারা। পিতার মৃত্যুর পরে তারা ভাই, চাচা বা অনুরূপ আত্মীয়দের দায়িত্বাধীনে চলে যায়। এ সকল আত্মীয় অনেক সময় তাদের সম্পদ পুরোপুরি বুঝে দেন না। কখনো বা ভাল জমি নিজে রেখে কমাটা তাকে দেয়। অথবা এতিমের সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করার বিনিময়ে এতিমের খরচপত্রের পরে উদ্বত্ত তার সম্পত্তির উপার্জন সবই তিনি নিজে ভোগ করেন। বিশেষত পিতার মৃত্যুর পরে বড় ভাই সাধারণত ছোট ভাইবোনদের সম্পত্তি এজমালীভাবে ভোগ করেন। তিনি ভাইবোনদের খাওয়া, পরা ও লেখাপড়ার ব্যবস্থা করেন। তবে সকল সম্পত্তির উপার্জন নিজের ইচ্ছামত খরচ করেন বা নিজরে নামে লিখে নেন। ভোনদেরকে দেয়া তো দূরের কথা ভাইদেরকেও ঠিকমতো দিতে চান না। তার যুক্তি একটাই তা হলো, ছোট থেকে মানুষ করে এখন লাঠি ফেলে ভাগ (?)! এভাবে আচারণ করেন অনক চাচা-বড় আব্বারাও। অথচ কুরআনে এ ব্যাপারে কত কঠোর সতর্কবাণী!
এমর্মে সূরা নিসার ২ নং আয়াতে ইরশাদ করা হয়েছে:
وَءَاتُواْ ٱلۡيَتَٰمَىٰٓ أَمۡوَٰلَهُمۡۖ وَلَا تَتَبَدَّلُواْ ٱلۡخَبِيثَ بِٱلطَّيِّبِۖ وَلَا تَأۡكُلُوٓاْ أَمۡوَٰلَهُمۡ إِلَىٰٓ أَمۡوَٰلِكُمۡۚ إِنَّهُۥ كَانَ حُوبٗا كَبِيرٗا۞
“এতিমদেরকে তাদের ধন-সম্পদ সর্ম্পন করবে এবং ভালোর সাথে মন্দ বদল করবে না। তোমাদের সম্পদের সাথে তাদের সম্পদ মিশিয়ে তাদের গ্রাস করবে না। নিশ্চয় তা মহাপাপ।”
সূরা নিসার ৬ নং আয়াতে আরো ইরশাদ করা হয়েছে:
وَٱبۡتَلُواْ ٱلۡيَتَٰمَىٰ حَتَّىٰٓ إِذَا بَلَغُواْ ٱلنِّكَاحَ فَإِنۡ ءَانَسۡتُم مِّنۡهُمۡ رُشۡدٗا فَٱدۡفَعُوٓاْ إِلَيۡهِمۡ أَمۡوَٰلَهُمۡۖ وَلَا تَأۡكُلُوهَآ إِسۡرَافٗا وَبِدَارًا أَن يَكۡبَرُواْۚ وَمَن كَانَ غَنِيّٗا فَلۡيَسۡتَعۡفِفۡۖ وَمَن كَانَ فَقِيرٗا فَلۡيَأۡكُلۡ بِٱلۡمَعۡرُوفِۚ فَإِذَا دَفَعۡتُمۡ إِلَيۡهِمۡ أَمۡوَٰلَهُمۡ فَأَشۡهِدُواْ عَلَيۡهِمۡۚ وَكَفَىٰ بِٱللَّهِ حَسِيبٗا۞
“বিবাহযোগ্য বা বয়ঃপ্রাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত তোমরা এতিমদের যাচাই করবে এবং তাদের মধ্যে ভালমন্দ বিচারের জ্ঞান দেখলে তাদের সম্পদ তাদেরকে ফিরিয়ে দেবে। তারা বড় হয়ে যাবে ভেবে তাড়াহুড়া করে অন্যায়ভাবে তাদের সম্পদ খেয়ো না। যে (অভিভাবক) অভাবমুক্ত সে যেন (এতিমদের সম্পদ থেকে কিছুমাত্র গ্রহণ করা থেকে) নিবৃত থাকে। আর যে (অভিভাবক) বিত্তহীত-অভাবী সে যেন সঙ্গত পরিমাণে ভক্ষণ করে। তোমরা যখন তাদেরকে তাদের সম্পদ সমর্পন করবে তখন সাক্ষী রেখ। হিসাব গ্রহণে আল্লাহই যতেষ্ট।”
সকল মানুষের সার্বজনীন অধিকারের পাশাপাশি মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক অতিরিক্ত কিছু অধিকার রয়েছে। এগুলির অন্যতম হলো আন্তরিক ভালবাসা ও ভ্রাতৃত্ব।
সূরা হুজরাতের ১০ নং আয়াতে আল্লাহ্ বলেন:
إِنَّمَا ٱلۡمُؤۡمِنُونَ إِخۡوَةٞ فَأَصۡلِحُواْ بَيۡنَ أَخَوَيۡكُمۡۚ وَٱتَّقُواْ ٱللَّهَ لَعَلَّكُمۡ تُرۡحَمُونَ۞
“মুমিনগণ পরস্পর ভাই ভাই; অতএব, তোমাদের ভ্রাতাগণের মধ্যে সুসম্পর্ক প্রতিষ্ঠা কর। আর (এই ব্যাপারে) আল্লাহকেই ভয় করো, যাতে তোমরা করুনা লাভ করতে পারো।”
এ মর্মে সহীহ্ বুখারী (৫/২২৫৩) বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, “তোমরা পরস্পরে হিংসা করবে না, দালালি করে দামবৃদ্ধি করবে না, পরস্পরে বিদ্বেষ পোষণ করবে না, পরস্পর শত্রুতা ও বিচ্ছিন্নতায় লিপ্ত হয়ো না, একজনের ক্রয়বিক্রয় প্রক্রিয়া চলমানকালে অন্যজন ক্রয়বিক্রয় বা দামাদামি করবে না, আল্লাহর বান্দারা, তোমরা সবাই পরস্পরে ভাই হয়ে যাও। একজন মুসলিম অন্য মুসলিম অন্য মুসলিমের ভাই। সে তাকে অত্যাচার করে না, তাকে বিপদে একা ছেড়ে দেয় না, তাকে অবজ্ঞা করে না। একজন মানুষের জন্য কঠিনতম অন্যায় যে, সে তার মুসলিম ভাইকে অবজ্ঞা অবমাননা করবে। একজন মুসলিমের জন্য অন্য মুসলিমের প্রাণ,সম্পদ ও সম্পদও সম্মান সবই হারাম।’
সহীহ্ বুখারী (১/১৪) বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ আরো বলেছেন, “তোমরা ততক্ষণ কেউ মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না নিজের জন্য যা পছন্দ করবে অন্য মুসলিম ভাইয়ের জন্যও তা-ই পছন্দ করবে।”
সহীহ্ মুসলিম (১/৭৪) বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, “তোমরা মুমিন না হওয়া পর্যন্তত জান্নাতে যাবে না এবং পরস্পরে একে অপরকে না ভালবাসলে মুমিন হতে পারবে না।”
সহীহ্ বুখারী (১/৪১৮) বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, “একজন মুসলিমের কাছে অন্য মুসলিমের ওয়াজিব পাওনা (অধিকার) ৬টি। যথা- (১) দেখা হলে সালাম দেয়া বা সালাম দিলে জাওয়াব দেয়া, (২) দাওয়াত দিলে কবুল করা, (৩) পরামর্শ চাইলে পরামর্শ দেয়া,(৪) হাঁচি দিয়ে আল হামদুলিল্লাহ বললে ‘ইয়ারহামুকাল্লাহ’ বলা, (৫) অসুস্থা হলে দেখতে যাওয়া এবং (৬) মৃত্যু হলে তার জানাযায় শরীক হওয়া।”
সহীহ্ বুখারী (২/৮৬৫) বর্ণিত হাদীসে রাসূল ﷺ বলেছেন, “যদি কেউ (গীবত-অপবাদ) কারো মর্যাদা-সম্মান নষ্ট করে বা অন্য কোনোভাবে কারো প্রতি জুলুম করে থাকে তবে সে যেন কিয়ামতের আগে আিই তার থেকে মুক্তি নিয়ে নেয়; কারণ সে দিন কোনো টাকাপয়সা থাকবে না। যদি তার নেক আমল থাকে তবে তার জুুলুমের পরিমাণ অনুসারে নেক আমল নিয়ে নেওয়া হবে। আর যিদি তার নেক আমল না থাকে তার সাথীর পাপ নিয়ে তার কাঁধে চাপানো হবে।”
পরিশেষে বলছি, হে আল্লাহ্! তুমি বড় দয়াল, তুমি বড়ো দাতা, ক্ষমা করো আমাদের সকল গুনাহ্ খাতা এবং আমাকেসহ আমাদের সকলকে পরিচালিত করো নাজাত ও তোমার সন্তুষ্টির পথে। আ-মী-ন।
Visit Our English Site : Click Here
Thanks for reading. جزاك الله خيرا