ইসলামে পোশাক ও পর্দা

 

-জালালুদ্দীন বিন নাজির হোসেন

পোশাক-পরচ্ছেদ মানুষের জীবনের অবিচ্ছেদ্য ও সার্বক্ষণিক বিষয়। প্রতিদিন প্রতিনিয়ত মানবদেহকে আবৃত করে রাখে তার পোশাক। পোশাকের মধ্যে যেমন মানুষের ব্যক্তিত্বের ও রুচির ছাপ ফুটে ওঠে তেমনি পোশাকও মানুষের আভ্যন্তরীন গুণাবলি, ব্যক্তিত্ব ও রুচির উপর প্রভাব বিস্তার করে। পোশাককে মানব সভ্যতার মূল বৈশিষ্ট্য ও আল্লাহর অন্যতম নিয়ামত হিসেবে উল্লেখ করে আল্লাহ বলেন:

يَا بَنِي آدم قَدْ أنْزَلْنَا عَلَيْكُمْ لِباسًا يُوَارِى سَوآتِكم وَرِيشًا وَلِبَاسُ التَّقْوَى ذلِكَ خيْرٌ ذلِكَ مِنْ آيَاتِ اللهِ لَعَلَّهُم يَذْكُرونَ.

“হে আদম সন্তানগণ, তোমাদের লজ্জাস্থান ঢাকবার ও বেশভুষার জন্য আমি তোমাদেরকে পোশাক-পরিচ্ছদ দিয়েছি এবং তাকওয়ার (আত্মারক্ষার) পরিচ্ছদই সর্বোৎকৃষ্ট। তা আল্লাহর নিদর্শনসমূহের অন্যতম, যাতে তারা উপদেশ গ্রহণ করে।” (সূরা আ‘রাফ : ২৬)

ইসলামে পোশাক ব্যবহারের জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে। সর্বপ্রথম ও সর্বপ্রধান নীতির কথাটি এ আয়াতে উল্লেখ করা হয়েছে, তা হলো, ‘লজ্জাস্থান’ বা দেহের গোপন অংশসমূহ আবৃত করা। এটিই পোশাকের মূল ‍উদ্দেশ্য। ইসলামী শরীয়তে পুরুষের জন্য নাভি থেকে হাঁটু পর্যন্ত স্থান গুপ্তাঙ্গ বা লজ্জাস্থান। দেহের এ অংশটুকু স্ত্রী ছাড়া অন্য মানুষের দৃষ্টি থেকে আবৃত করে রাখা ফরয।

নারীর গুপ্তাঙ্গ আবৃতব্য লজ্জাস্থানের ৪টি পর্যায় রয়েছে। 

১. প্রথম প্রর্যায়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন পর্দা নেই, নেই কোন পোষাকের বিধান।

২. একজন মুসলিম মহিলার জন্য অন্য মুসলিম মহিলার সামনে নাভী থেকে হাটু পর্যন্ত আবৃত রাখা ফরয।

৩. চিরতরে বিবাহ নিষিদ্ধ রক্ত সম্পর্কের নিকটতম পুরুষ “মাহরাম” আত্মীয়দের মুসলিম নারী নিজের শরীর আবৃত করে থাকবেন, তবে মুখ, মাথা, গলা, বাজু, পা অনাবৃত রেখে তাদের সামনে যেতে পারেন।

৪. মুসলিম মেয়েদের পোশাকের ৪র্থ ও সাধারণ পর্যায় হলো অন্যান্য পুরুষদের সামনে। নিকটতম ‘মাহরাম’ আত্মীয় ছাড়া সকল আত্মীয় ও অনাত্মীয় পুরুষের সামনে মেয়েরা তাদের শরীর পুরোপুরি আবৃত করে রাখবেন। এ বিষয়ে সুরা নূর-এর ৩১ আয়াতে আল্লাহ বলেন:

“মুমিনদেরকে বলুুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং লজ্জাস্থানের হিফাজত করে, এই তাদের জন্য অধিকতর পবিত্র। তারা যা করে আল্লাহ সে বিষয়ে অবহিত এবং মুমিন নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টিকে সংযত করে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। তারা যেন (স্বভাবতই) যা প্রকাশিত তা ব্যতীত তাদের সৌন্দর্য-অলঙ্কার প্রদর্শন না করে। তাদের গ্রীবা ও বক্ষদেশ যেন তারা মাথার কাপড় দ্বারা আবৃত করে। তারা যেন তাদের স্বামী, পিতা, শ্বশুর, পুত্র, স্বামীর পুত্র, ভ্রাতা, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, আপন নারীগণ, তাদের মালিকানাধীন দাসী, পুরুষদের মধ্যে যৌন-কামনা রহিত পুরুষ এবং নারীদিগের গোপন অঙ্গ সম্বন্ধে অজ্ঞ বালক ব্যতীত অন্য কারো কাছে তাদের সৌন্দর্য-অলঙ্কার প্রকাশ না করে। তারা যেন তাদের গোপন অলঙ্কার প্রকাশের উদ্দেশ্যে সজোরে পদক্ষেপ না করে। হে মুমিনগণ, তোমরা সকলে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন কর, যাতে তোমরা নফলকাম হতে পারবে।”

এ সকল আয়াত এবং এ বিষয়ক অসংখ্য হাদীসের ভিত্তিতে মুসলিম উম্মাহ্ একমত যে, মাহরাম ছাড়া সকল আত্মীয় ও অনাত্মীয় পুরুষের সামনে মুমিন নারীর পুরো দেহ আবৃত করে রাখা ফরয। শুধু মুখমন্ডল ও কব্জি পর্যন্ত দু হাতের বিষয়ে ফকীহগণের মতভেদ রয়েছে। কোনো কোনো ফকীহ্ বলেছেন, মুখমন্ডল আবৃত রাখা উত্তম, তবে অনাবৃত রাখা বৈধ। অন্যান্য ফকীহ্ বলেছেন, চক্ষু উন্মক্ত রেখে মুখমন্ডল আবৃত রাখা ফরয। এই মতবিরোধ শুধুমাত্র মুখ ও হাতের বিষয়ে। মাথার চুল থেকে পা পর্যন্ত শরীরের বাকী অংশ আবৃত করা যে মেয়েদের জন্য ফরয সে বিষয়ে মুসলিম উম্মাহ একমত। কুরআন ও হাদীসের স্পষ্ট নির্দেশে ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যমত্যের আলোকে তাছাড়া আমরা বুঝতে পারছি যে, গাইর মাহরাম সকল আত্মীয় ও অনাত্মীয় পরুষের সামনে মাথা, মাথার চুল, গলা, ঘাড়,কনুই কোমর ইত্যাদি সহ নিজের দেহ পুরোপুরি ঢেকে রাখা প্রতিটি মুসলিম নারীর জন্য ফরয।

নারী স্বাধীনতার নামে মুসলিম মহিলাদেরকে সেই পথে ডাকা হচ্ছে। সর্বত্র একটি দৃশ্য আমাদের নযরে পড়ে। পুরুষ মাথা থেকে পা পর্যন্ত আবৃত করে পোশাক পরেছেন। তার পাশে মহিলা দাঁড়িয়ে আছেন শরীরের অধিকাংশ স্থান অনাবৃত করে। শালিন পোশাক যদি স্বাধীনতার পরিপন্থী হয় তাহলে এই পুরষটি কি স্বাধীনতা বিহীন? তিনি কি তার পাশের মহিলার অধীন?? একজন পুরুষ যদি তার পুরো শরীর আবৃত করেও স্বাধীনতা ও ভদ্রতা রক্ষা করতে পারেন তাহলে মহিলা কেন পারবেন না? একজন মহিলার দেহ অনাবৃত করলে তার কি কোনো দৈহিক, মানসিক বা সামাজিক লাভ আছে? একমাত্র বেহায়া পুরুষদের কুদৃষ্টির পরিতৃপ্তি দান ছাড়া এর আর কোনো উদ্দেশ্য আছে কি? এ সকল বেহায়া পশু চুরত্রের পুরুষেরাই বিভিন্ন অজুহাতে মেয়েদেরকে নগ্ন করে তাদের নারীত্ব ও শালীনতা নষ্ট করতে চায়।

একজন মুসলিম নারীর জন্য বেপর্দায় চলাফেরা করা তথা আত্মীয়-অনাত্মীয়দের নিকট গমনা-গমন করা যেনা-ব্যভিচার, মদ্যপান ও অন্যান্য কঠিন হারাম কর্মগুলির মতই কঠিন হারাম কর্ম। 

মুসলিম মহিলার জন্য জন্য এগুলি আবৃৃত করা যেমন ফরয, তাকে শরীয়তের মধ্যে পরিচালিত করা তার স্বামী বা পিতার জন্যও অনুরূপ ফরয আইন। আমরা সমাজে এমন অনেক দীনদার মানুষ দেখতে পাই, যিনি নিজে দাড়ি রেখেছেন এবং টুপি পরিধান করেন, অথচ তার স্ত্রী বা কন্যা মাথা, চুল বা দেহের অন্যান্য অংশ অনাবৃত করে চলেন। দাড়ি রাখা ওয়াজিব, টুপি পরা সুন্নাত, কিন্তু স্ত্রী ও কন্যার মাথায় কাপড় পরানো ও তাদেরকে পর্দা মানানো ফরয। আর ফরয বাদ দিয়ে ওয়াজিব, সুন্নাত বা নফল পালনের অর্থই হলো নগ্ন হয়ে পাগড়ী পরা। আমরা অনেকেই এরূপ উদ্ভট ধার্মিকতায় লিপ্ত।

সূরা আযহাবের ৫৯ নং আয়াতে আল্লাহ এরশাদ করেছেন,

“হে নবী, আপনি আপনার স্ত্রীগণকে, কন্যাগণকে ও মুমিনদের নারীদেরকে বলুন, তারা যেন তাদের জিলবাবের (চাদরের) কিয়দংশ নিজেদের উপর টেনে দেয়, এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে, ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ্ ক্ষমাশীল করুণামায়।”

এ আয়াতে আল্লাহ্ পর্দার নির্দেশনার সাথে সাথে পর্দার কারণও উল্লেখ করছেন।

পর্দানশীন মেয়েকে ভদ্র, সম্ভ্রান্ত ও শালীন বলে চেনা যায় এবং সাধারণভাবে বখাটে বা অসৎ ছেলেরা এদের উত্তক্ত্য করে না। আমাদের সমাজে এবং যে কোনো সমাজে এবং অগণিত ধর্ষণ, অত্যাচার ও এমিডে ঝলসে দেয়ার ঘটনার দিকে তাকালেও আমরা দেখতে পাই, যে সকল মেয়ে পর্দার মধ্যে বেড়ে উঠেন। সাধারণত সবচেয়ে কঠিন হৃদয় বখাটেও কোন পর্দানশীন মেয়েকে উত্তক্য করতে দ্বিধা করে। 

পাতলা শাড়ী এবং পাতলা ব্লাউজ পরিধানকারিনী জান্নাতের গন্ধও পাবে না

আবূ হুরায়রা (রা) থেকে বর্ণিত। নবী করীম ইরশাদ ফরমান, আমি জাহান্নামীদের দুটি দলকে এখনো পর্যন্ত দেখিনি। একদল এমন যাদের গরুর লেজের  ন্যায় লাঠি হবে। এর দ্বারা মানুষকে অন্যায়ভাবে মারবে। দ্বিতীয় দল ঐ সমস্ত মহিলা হবে (যারা প্রকাশ্যভাবে) কাপড় পরিাধান করবে তাসত্ত্বেয়ও উলঙ্গ থাকবে। (তারা পুরুষকে নিজের প্রতি আকৃষ্ট করার জন্য কাপড় পরিধান করবে।) এ সমস্ত মহিলাদের মাথা হবে উটের কুঁজের ন্যায় যা ঝুঁকে থাকবে। (অর্থাৎ,মাথার চুল পেছনে দিকে একত্র করে উপরের দিকটা ফ্যাশন করে উঠিয়ে রাখবে) এ সমস্ত মহিলারা জান্নাতে যাওয়া তো দূরের কথা জান্নাতের গন্ধও পাবে না। অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ অনেক দূর থেকে (পাঁচশ‘ বছরের রাস্তা থেকে) পাওয়া যাবে। (সহীহ্ মুসলিম ২/২০৫)  

পাতলা ওড়না ব্যবহার করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ

’আয়িশা (রা) বলেন, আসমা বিনতে আবূ বকর (রা) একদা রাসূল -এর দরবারে আগমণ করেন। তার গায়ে ছিল তখন পাতলা ওড়না। এ অবস্থা দেখে রাসূল (ছা) কিছুটা মনোক্ষুন্ন হলেন এবং বলেন, হে আসমা! মেয়েরা যখন বালেগা হয় তখন তার শরীর যেন কেউ দেখতে না পায়। তবে এটা ছাড়া (রাসূলুল্লাহ্ এ কথা দ্বারা মুখমন্ডল ও হাতের দিকে ইঙ্গিত করেছেন)।

Visit Our English Site Click Here 



Thanks for reading. جزاك الله خيرا

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url