রাসূল (ছাঃ)-এর ইন্তিকাল
১০ম হিজরীর সালের শেষ দিক (৬৩২ খ্রি.) রাসূল (ছাঃ)লক্ষাধীক সাহাবীকে সাথে নিয়ে হজ্জ আদায় করেন, যা বিদায় হজ্জ নামে পরিচিত। এর পরের বছর তথা ১১ হিজরীর শুরুর দিকেই রাসূল (ছাঃ) অসুস্থ্য হয়ে পড়েন। তিনি প্রায় ১০/১২ দিন অসুস্থ্য থেকে এই ধরা হতে চির বিদায় গ্রহণ করেন।
তাঁর ইন্তিকালের তারিখ সম্পর্কেও একাধিক মত পাওয়া যায়। কেউ বলেন ১লা রবিউল আউয়াল, কেউ বলেন ২রা রবিউল আউয়াল, কেউ বলেন ১২ রবিউল আউয়াল, আবার কেউ ১৩ রবিউল আউয়ালের কথাও বলেছেন। (ফাতহুল বারী ৮/১২৯)
বিদায় হজ্জ শেষে রাসূল (ছাঃ)-এর উপর সূরা আন-নাসর নাযিল হয়।
রাসূল (ছাঃ) বলেন, এই সূরা আন-নাসর নাযিলের মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমার মিশনের পূর্ণতা ও সমাপ্তির কথা জানিয়েছেন এবং আমার মৃত্যুর সংবাদও এ সূরায় প্রদান করা হয়েছে।’ মদীনায় ফেরার পর রাসূল (ছাঃ) উঠতে, বসতে, মজলিসে, সালাতের রুকু-সিজদায় ও সর্বাবস্থায় বেশি বেশি বলতেন-سُبْحَانَكَ وَبِحَمْدِكَ أسْتَغْفِرُكَ وَأَتُوْبُ إِلَيْكَ মহা পবিত্রতা আপনারই এবং প্রশংসাসহ, আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি এবং তাওবা করছি।) {সহীহ্ মুসলিম,১ম খন্ড, হা/৩৫১}
উক্বাবাহ্ ইবনু আমের (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) একদিন বের হয়ে ওহুদের শহীদগণের উপর জানাযার সালাতের ন্যায় সালাত আদায় করলেন। এরপর তিনি মিম্বরের কাছে ফিরে আসলেন এবং বললেন: আমি তোমাদের আগে চলে যাচ্ছি (মৃত্যু বরণ করছি)। আমি তোমাদের জন্য সাক্ষী। আল্লাহর কসম, আমি এখন আমার হাউয (হাউযে কাওসার) দেখতে পাচ্ছি। আমাকে এই দুনিয়ার সমগ্র ধনভান্ডারের চাবিকাঠী দেওয়া হয়েছে। অন্য বর্ণনায়, যমীন ও আসমানের সমগ্র ধনভান্ডারের চাবীসমূহ আমাকে দেওয়া হয়েছ। আর আল্লাহর কসম, আমি তোমাদের ব্যাপারে এই আশংকা করছি না যে, তোমরা মুশরিক হয়ে যাবে; বরং আমি আশংকা করছি যে, তোমরা সেগুলি (ভান্ডারগুলি) নিয়ে প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়ে যাবে। (সহীহ্ বুখারী, ১ম খন্ড, হা/৪৫১)
একদা রাসূল (ছাঃ) রাতের গভীরে তাঁর খাদেম আবূ মুআইহিবাকে সাথে নিয়ে বাকী গোরস্থানে যেয়ে মৃতদের জন্য দু’আ করেন এবং মুআইহিবাকে বলেন, হে মুআইহিবাহ্! নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা আমাকে সমগ্র বিশ্বের ধনভান্ডারের মালিকানা, পৃথিবীতে অনন্ত জীবন এবং পরিশেষে জান্নাতলাভ অথবা আমার প্রতিপালকের সাক্ষাৎলাভ-এ দুয়ের যেকোন একটি গ্রহনের ইখতিয়ার দিয়েছেন। তখন আমি (মুআইহিবা) বললাম, আমার পিতামাতা আপনার জন্য কুরবানী হোন! তাহলে আপনি পৃথিবীর ভান্ডারসমূহ এবং পৃথিবীতে অনন্ত জীবন এবং এরপর জান্নাত বেছে নেন। তিনি বলেন, কখনোই না! আবূ মুআইহিবা, আমি আমার প্রতিপালকের সাক্ষাত বেছে নিয়েছি। (হাকিম, আল-মুসতাদরাক ৩/৫৭; হাদীসটি সহীহ্)
ছহীহ্ বুখারীতে আয়শা (রা), আবূ হুরায়রা (রাঃ)সহ অনেক সাহাবী রাসূল (ছা)-এর মৃত্যু পূর্ববর্তী সময়ের অবস্থা বর্ণনা করে হাদীস বর্ণিত হয়েছে। তেমনি একটি হাদীস, যা রাসূল (ছা)-এর মৃত্যুর ৫দিন পূর্বে আল্লাহর রাসূলের অন্তিম নছিহতের অংশ বিশেষ:
রাসূল (ছাঃ) বলেন, “তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোন! তোমাদের পূর্ববর্তী জাতিসমূহের মানুষেরা তাদের নবীগণ ও ওলীগণের কবরকে মসজিদ (সিজদার স্থান) বানিয়ে নিত। তোমরা সাবধান! তোমরা কখনো কবরকে মসজিদ বানিয়ে নেবে না, নিশ্চয়ই আমি তোমাদেরকে নিষেধ করছি এই কাজ থেকে।”...
“আল্লাহ লানত-অভিশাপ প্রদান করেন ইহুদী ও খৃস্টানদের উপর, তারা তাদের নবীগণের কবরকে মসজিদ বানিয়ে নিয়েছিল।” একথা বলে তিনি তাঁর উম্মতকে অনুরূপ কর্ম থেকে সাবধান করছিলেন। ... “তোমরা আমার কবরকে ঈদ (ঈদগাহ বা নিয়মিত সমাবেশের স্থান) বানিও না, আর তোমাদের আবাসস্থলকে কবর বানিয়ে নিওনা। তোমরা যেখানেই থাক না কেন আমার উপর সালাত (দরুদ) পাঠ করবে, কারণ তোমাদের সালাত আমার কাছে পৌঁছে যাবে।” “হে আল্লাহ্! আমার কবরকে পূজিত দ্রব্য বা পূজ্য-স্থানের মতো বানিয়ে দিবেন না যার ইবাদত করা হবে, আল্লাহর ক্রোধ কঠিনতর হোক সে সকল মানুষের উপর যারা তাদের নবীগণের কবরগুলিকে মসজিদ বানায়। (ছহীহ্ বুখারী, ১/১৬৫, ১৬৮,৪৪৬ ইত্যাতদ)
তাঁর অসুস্থতা বৃদ্ধি পেতে থাকলে তিনি বারবার বলছিলেন:
الصلاة (الصلاة) وما ملكت أيمانكم.
“সালাত! সালাতের বিষয়ে সাবধান! (কোনরূপ অবহেলা করবে না) এবং তোমাদের দাস-দাসীদের (অধীনস্থগণের) বিষয়ে সাবধান! তাদের পানাহার, পোশাক-পরিচ্ছদে ত্রুটি করবে না, তাদের সাথে ভাল ব্যবহার করবে। তাদের বিষয়ে আল্লাহকে ভয় করবে।” এভাবে তিনি বারবার বলতে থাকেন। (সুনানু ইবনি মাজাহ্ ১/৫১৮)
রাসূল (ছাঃ)-এর একবারে অন্তিম সময় সম্পর্কে আয়শা (রাঃ) বলেন, রাসূল (ছাঃ) (অসুস্থ থাকার কারণে) আমার কোলে ভর দিয়ে শায়িত ছিলেন, এমতাবস্থায় আমার ভাই আব্দুর রহমান আসল। তার হাতে একটি মেসওয়াক ছিল। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) মেসওয়াকটির দিকে তাঁকাচ্ছিলেন। আমি বুঝলাম যে তিনি মেসওয়াক করতে চাচ্ছেন। আমি বললাম, আমি কি মেসওয়াকটি আপনার জন্য নেব? তিনি ইশারা করে বললেন, হ্যাঁ। তখন আমি সেটি নিয়ে তাঁকে দিলাম। কিন্তু সেটি তাঁর জন্য শক্ত ছিল। আমি বললাম, আমি কি নরম করে দিব? তিনি মাথা নেড়ে সম্মতি দিলেন। তখন আমি তা নরম করে দিলাম এবং তিনি তা মুখে বুলালেন। তার সামনে একটি পাত্রে পানি ছিল। তিনি পানির মধ্যে দুহাত প্রবেশ করিয়ে আদ্র হস্তদ্বয় দ্বারা তাঁর কপাল মুছছিলেন এবং বলছিলেন: লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ্, মৃত্যুর অনেক যন্ত্রণা আছে। এরপর তিনি তাঁর হাত উঠিয়ে বলতে লাগলেন: সর্বোচ্চ সাথীদের মধ্যে। হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন এবং আমাকে সর্বোচ্চ সাথীদের সঙ্গে রাখুন। এরূপ বলতে বলতে তিনি ইন্তিকাল করেন এবং তাঁর হাতটি নেমে যায়। (সহীহ্ বুখারী, ৪/১৬১৬)
মৃত্যুর সময় রাসূল (ছাঃ)-এর বয়স ছিল ৬৩ বৎসর।
রাসূল (ছাঃ)-এর নির্দেশনা অনুসারে আয়েশা (রাঃ)-এর ঘরের মধ্যে যেখানে রাসূল (ছাঃ) ইন্তেকাল করেন সেখানেই তাঁকে দাফন করা হয়।
রাসূল (ছাঃ)-এর পরিবার
স্ত্রীগণ
রাসূল (ছাঃ)-এর ১১ জন স্ত্রী ছিলেন। তাঁরা হলেন-
১. খাদিজাহ্ বিনতে খুওয়াইলিদ (রাঃ)
২. সাওদাহ্ বিনতে যাম‘আহ্ (রাঃ)
৩. আয়েশা সিদ্দিকা বিনতে আবূ বকর (রাঃ)
৪. হাফসাহ্ বিনতে উমর বিন খাত্তাব (রাঃ)
৫. যায়নাব বিনতে খুযায়মাহ্ (রাঃ)
৬. উম্মে সালামাহ্ হিন্দ বিনতে আবী উমাইয়া (রাঃ)
৭. সায়লাব বিনতে জাহশ বিন রিবাব (রাঃ)
৮. জুওয়াইরিয়াহ্ বিনতে হারিস (রাঃ)
৯. উম্মে হাবীবাহ্ রামলাহ্ বিনতে আবূ সুফইয়ান
১০. সাফিয়্যাহ্ বিনতে হুওয়াই বিন আখতাব (রাঃ)
১১. মায়মুনাহ্ বিনতে হারিস (রাঃ)
(আর রাহিকুল মাখতুম, পৃ-৫৩৮)
রাসূল (ছাঃ)-এর সন্তানগণ
ইবনুল কাইয়্যিম (রহ.) বলেন, নবীজী (ছাঃ)-এর ৩ পুত্র ও ৪ কণ্যা মোট ৭ জন সন্তান। প্রথম সন্তান কাসিম। অতঃপর পর্যায়ক্রমে যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতিমা, আব্দুল্লাহ্ এবং সবশেষে হিজরতের পর মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন ইবরাহীম (রা)।
Visit Our English Site : Click Here
Thanks for reading. جزاك الله خيرا
