জান্নাতী মানুষের গুণাগুণ

 

-জালালুদ্দীন বিন নাজির হোসেন


আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা জান্নাতিদের গুণাগুণ বর্ণনা করে কুরআন মাজিদে ইরশাদ করেনঃ

ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي ٱلسَّرَّآءِ وَٱلضَّرَّآءِ وَٱلۡكَٰظِمِينَ ٱلۡغَيۡظَ وَٱلۡعَافِينَ عَنِ ٱلنَّاسِۗ وَٱللَّهُ يُحِبُّ ٱلۡمُحۡسِنِينَ-

“যারা স্বচ্ছলতা ও অভাবের মধ্যে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও লোকদেরকে ক্ষমা করে; এবং আল্লাহ্ সৎ কর্মশীলদের ভালবাসেন।” (সূরা আলে ইমরান : ১৩৪)

উক্ত আয়াতে কারীমায় জান্নাতীদের গুণগুণ বা বৈশিষ্ট বর্ণনা করে বলা হয়েছে তারা সুখে-দুঃখে, আপদে-বিপদে, এবং স্বচ্ছলতায় ও অভাবে, অভাবে, মোট কথা, সর্বাবস্থায়ই আল্লাহ্ তা‘আলার পথে ব্যয় করে। যেমন অন্য জায়গায় রয়েছেঃ 

ٱلَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمۡوَٰلَهُم بِٱلَّيۡلِ وَٱلنَّهَارِ سِرّٗا وَعَلَانِيَةٗ -

“যারা রাতে ও দিনে, গোপনে ও প্রকাশ্যে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে।” (সূরা বাকারাহ্ : ২৭৪)

কোন কিছু তাদেরকে আল্লাহর আনুগত্য হতে বিরত রাখতে পারেনা। তারা তাঁর নির্দেশক্রমে তাঁর সৃষ্টজীবের ‍উপর অনুগ্রহ করে থাকে। এমন কি তারা তাদের ক্রোধ পর্যন্তও প্রকাশ করেনা।

হাদীসে রয়েছে, রাসূলুল্লাহ্ ﷺ বলেছেনঃ

‘ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ নয় যে কেহকে মল্লযুদ্ধে পরাস্ত করে, বরং প্রকৃতপক্ষে ঐ ব্যক্তি বীর পুরুষ যে ক্রোধের সময় ক্রোধ দমন করতে পারে।’ (আহমাদ ২/২৩৬, ফাতহুল বারী ১০/৫৩৫, মুসলিম ৪/২০১৪)

সহীহ্ বুখারীসহীহ্ মুসলিমে আরো বর্ণিত হয়েছে, রাসূল জনগণকে জিজ্ঞেস করেন : ‘তোমাদের মধ্যে এমন কেহ আছে কি যার নিকট তার উত্তরাধিকারীর সম্পদে নিজের সম্পদ অপেক্ষা বেশি প্রিয় হয়?’ জনগণ বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাদের মধ্যে এমন কেউই নেই।’ তখন রাসূল বলেন, ‘আমি তো দেখেছি যে, তোমরা তোমাদের নিজস্ব সম্পদ অপেক্ষা তোমাদের উত্তারাধিকারীদের সম্পদকেই বেশি পছন্দ করছ! কেননা প্রকৃতপক্ষে তোমাদের নিজস্ব সম্পদতো ওটাই যা তোমরা তোমাদের জীবদ্দশায় আল্লাহ্ তা‘আলার পথে ব্যয় করে থাক, যা তোমরা ছেড়ে যাও তা তো তোমাদের সম্পদ নয়, বরং তোমাদের উত্তরাধিকারীদের সম্পদ। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার পথে খরচ কম করা এবং জমা বেশি রাখা- এটাই প্রমাণ যে, তোমরা তোমাদের নিজেদের সম্পদ অপেক্ষা উত্তরাধিকারীদের সম্পদকেই বেশি ভালবাস।’ অতঃপর তিনি বলেনঃ ‘কোন লোককে বীর পুরুষ মনে কর?’ জনগণ বলেনঃ ‘হে আল্লাহর রাসূল ! ঐ ব্যক্তিকে (আমরা বীর পুরুষ মনে করি) যাকে কেহ মল্লযুদ্ধে নীচে ফেলতে পারেনা।’ তখন রাসূল বললেনঃ ‘না, বরং প্রকৃতপক্ষে শক্তিশালী বীর পুরুষ ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজকে সামলে নিতে পারে।’ তারপর তিনি বলেনঃ ‘তোমরা নিঃসন্তান কাকে বল?’ জনগণ বলেনঃ ‘যাদের কোন সন্তান-সন্ততি নেই।’ তিনি বলেনঃ ‘না, বরং নিঃসন্তান ঐ ব্যক্তি যার সামনে তার কোন সন্তান মারা যায়নি।’


রাসূল ﷺ  আরো বলেনঃ 

‘যে বক্তি কোন দরিদ্রকে অবকাশ দেয় কিংবা তার ঋণ ক্ষমা করে দেয়, আল্লাহ্ তাকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে থাকেন। হে জনমন্ডলী! জেনে রেখ যে, জান্নাতের কাজ খুব কঠিন এবং জাহান্নামের কাজ সহজ। সৎ ঐ ব্যক্তি যে গন্ডগোল হতে বেঁচে যায়। (ইবনে কাসীর)

ইমাম আহমাদ (রহ) অন্যত্র বর্ণনা করেন যে, সাহল ইব্ন মুয়াজ ইব্ন আনাস (রহ) বলেন যে, তার পিতা বলেছেন, রাসূল ﷺ রাসূল বলেছেনঃ ‘বান্দা কর্তৃক নিজকে সংযত করার চেয়ে ভাল আর কোন উদাহরণ নেই। তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা সমস্ত মাখলূকের সামনে ডেকে অধিকার প্রদান করবেন যে, সে যে কোন হুরকে ইচ্ছা মত পছন্দ করতে পারে।’ (আহমাদ ৩/৪৩৮, ৪৪০; আবূ দাঊদ ৫/১৩৭, তিরমিযী ৬/১৩৯, ইবনে মাজাহ্ ২/১৪০০)

ইব্ন মারদুয়াই (রহ) ইব্ন উমার (রা) থেকে আর একটি হাদীস বর্ণনা করেন যে, রাসূল রাসূল বলেছেনঃ বান্দা কর্তৃক নিজকে সংযত রাখার ক্ষমতা আয়ত্ত করার চেয়ে উত্তম কাজ আর নেই। যে বান্দা তা করতে পারবে সে আল্লাহর চেহারা দেখার সৌভাগ্য লাভ করবে। (আহমদ ২/২১৮, ইব্ন মাজাহ্ ২/১৪০১)

এ বিষয়ে আরও বহু হাদীস রয়েছে। সুতরাং আয়াতের ভাবার্থ হল এই যে, তাদের ক্রোধ বাইরে প্রকাশ পায়না এবং তাদের পক্ষ হতে লোকের প্রতি কোন অন্যায় করা হয়না। বরং তারা উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখে। আর তারা আল্লহকে ভয় করে সাওয়াবের আশায়। সমস্ত কাজ আল্লাহ্ তা‘আলার উপর সমর্পণে করে। তারা মানুষের অপরাধ ক্ষমা করে দেয়। অত্যাচারীদের অত্যাচারের প্রতিশোধ তারা গ্রহণ করেনা। একেই বলে অনুগ্রহ এবং এরূপ অনুগ্রহশীল বান্দাকেই আল্লাহ্ তা‘আলা ভালবাসেন। 

হাদীসে রয়েছে যে, রাসূল বলেছেনঃ

‘তিনটি কথার উপর আমি শপথ করছিঃ (১) সাদাকাহ্ দ্বারা সম্পদ হ্রাস পায়না, (২) মানুষের অপরাধ ক্ষমা করার মাধ্যমে মানুষের সম্মান বেড়ে যায় এবং (৩) আল্লাহ্ তা‘আলা বিনয় প্রকাশকারীর মর্যাদা বাড়িয়ে দেন।’ (মুসনাদ আহমাদ ৪/২৩১)

উল্লেখ্য, জান্নাতিদের আরো বেশ কিছু গুণাগুণ বা বৈশিষ্ট্য রয়েছে। যা অন্য সময় আলোচনা করা হবে ইনশা-আল্লাহ্। এই পোস্টে উল্লেখিত আয়াতে কারীমার আলোকে এই কয়েকটি গুণাগুণ আলোচনা করা হলো। আল্লাহ্ আমাদের সকলকে উল্লেখিত গুণবলী ও অন্যান্য সকল গুণাবলী অর্জন করার এবং জান্নাত লাভে নিজেকে ধন্য করার তৌফিক দান করুন। আ-মী-ন


Visit Our English Site : Click Here 



Thanks for reading. جزاك الله خيرا


Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url