বিবাহ ও পরিবার
শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবাহ
মানব সভ্যতার মূল উপাদান “মানুষ”। আর পরিবারের মাধ্যমেই মানুষের জন্ম ও সংরক্ষণ। পরিবার গঠিত হয় বিবাহের মাধ্যমে। বিবাহ ওপরিবারই মানব সমাজের মূল ভিত্তি এবং পরিবারের অস্তিত্বের উপরেই নির্ভর করে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব। অতীতে বিভিন্ন সমাজে ধর্মের নামে বিবাহ ও পরিবার গঠন এবং পরিবারের সদস্যদের প্রতি দায়িত্ব পালনকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। পক্ষান্তরে আধুনিক যুগে সভ্যতা, নারী অধিকার, নারীর ক্ষমতায়ন, সমঅধিকার ইত্যাদির নামে এবং সর্বোপরি অশ্লীলতার প্রসারের কারণে বিবাহ ও পরিবার গঠনের আগ্রহ কমে গিয়েছে। উপরন্তু গঠিত পরিবারের বিচ্ছেদ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি বস্তুত আধুনিক ভোগবাদী সভ্যতায় বিবাহ ও পরিবারের অস্তিত্ব প্রায় বিপন্ন। যে জনগোষ্ঠী যত “সভ্য” বাব যত “উন্নত” হচ্ছে সে সমাজের মানুষদের মধ্যে বিবাহ ও পরিবার গঠনের প্রবণতা তত হ্রাস পাচ্ছে। এনকার্টা এনসাইক্লোপিডীয়ার তথ্য থেকে দেখা যায় যে, ১৯৭০ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যা শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ ছিল বিবাহিত পরিবার এভং ২০ ভাগ ছিল অবিবাহিত নারী বা পুরুষ। অথচ ২০০০ সালে মাত্র ৬০ ভাগ মানুষ বিবাহিত পরিবার। এদের মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি সন্তানবিহীন। আর বাকী প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ পরিবার বিহীন একক নারী বা পুরুষ। সকল শিল্পোন্নত দেশেরই একই অবস্থা। পারিবারিক কাঠামো ভেঙ্গে পড়া ও পরিবার-বিহীন মানুষের সংখ্যা এভাবে বৃদ্ধি পাওয়ার অর্থই দু-এক শতাব্দীর মধ্যে সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর বিলুপ্তি।
মানুষের প্রকৃতিতে যা কিছু দান করেছেন সবই তাঁর রহমত ও এ বিশ্বকে আবাদ করার জন্য মানুষের প্রতি তাঁর দান। এগুলির সুষ্ঠ ও প্রকৃতি সম্মত ব্যবহারই এ পৃথিবীর শান্তি ও মানব সভ্যতার স্থায়িত্বের পথ। আর মানব প্রকৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিপরীত লিঙ্গের প্রতি আকর্ষণ ও সন্তাত-সন্ততিরি প্রতি আকর্ষণ। মানেষের জৈবিক ও মানসিক এ উভয় আগ্রহের প্রাকৃতিক ও স্বাভাবিক পরিণতি হলো পরিবার গঠন। এজন্য বিবাহের মাধ্যমে পরিবার গঠনকে ইসলামে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্যলাভের অন্যতম পথ হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইরশাদ করেনঃ
وَأَنكِحُواْ ٱلۡأَيَٰمَىٰ مِنكُمۡ وَٱلصَّٰلِحِينَ مِنۡ عِبَادِكُمۡ وَإِمَآئِكُمۡۚ إِن يَكُونُواْ فُقَرَآءَ يُغۡنِهِمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦۗ وَٱللَّهُ وَٰسِعٌ عَلِيمٞ- وَلۡيَسۡتَعۡفِفِ ٱلَّذِينَ لَا يَجِدُونَ نِكَاحًا حَتَّىٰ يُغۡنِيَهُمُ ٱللَّهُ مِن فَضۡلِهِۦۗ
“তোমাদের মধ্যে যারা সঙ্গীবিহীন পুরুষ বা মহিলা তোমরা তাদেরকে বিবাহ দাও এবং তোমাদের অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ তো প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ। আর যাদের বিবাহের সামর্থ নেই, আল্লাহ তাদেরকে নিজ অনুগ্রহে অভাবমুক্ত না করা পর্যন্ত যেন তারা সংযম অবলম্বন করে।…। (সূরা নূর : ৩২-৩৩)
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন:
“হে যুবকের দল, তোমাদের মধ্যে যারা বিবাহের দায়িত্বাদি পালন করতে সক্ষম তারা যেন বিবাহ করে, কারণ বিবাহ তার চক্ষুকে অধিকতর সংযত করবে এবং তার যৌন অংগকে অধিকতর সংযত-সংরক্ষিত রাখবে। আর যে তাতে সক্ষম হবে না সে যেন সিয়াম পালন করে, কারণ, সাওম তাকে সংযত করবে।” (সহীহ্ বুখারী ২/৬৭৩, ৫/১৯৫০; সহীহ্ মুসলিম ২/১০১৮-১০১৯)
বিভিন্ন হাদসে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিবাহের গুরুত্ব জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন:
“বিবাহ আমার সুন্নাত বা রীতি। কাজেই যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত অনুযায়ী কর্ম করবে না সে আমার সাথে সম্পর্কিত নয়। তোমরা বিবাহ করো, কারণ আমি আমার উম্মতের বর্ধিত সংখ্যা দিয়ে অন্যান্য জাতির কাছে গৌরব প্রকাশ করব।” (ইবনু মাজাহ ১/৫৯২, সনদ সহীহ)
ইবাদত-বন্দেগীর অযুহাতে বিবাহ-সংসার বর্জন করা একটি প্রাচীন প্রবণতা। যুগে যুগে অগণিত আবেগী ধার্মিক মানুষ আল্লাহর ইবাদতের একগ্রতার ক্ষেত্রে বিবাহ সংসারকে বাঁধা মনে করেছেন এবং বৈরাগ্যকে উৎসাহ দিয়েছেন এবং উচ্চমার্গের ধার্মিকতা বলে গণ্য করেছেন। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খৃস্টান ধর্মে এভাবে পরিবারগঠন নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। বাইবেলে যীশু খৃস্ট বিবাহ না করে “স্বর্গরাজ্যের নিমিত্ত নপুংসক” হয়ে থাকার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। (মথি ১৯/৯-১২)
প্রচলিত খৃস্টধর্মের প্রতিষ্ঠাতা সাধু পৌল বিবাহ না করা উত্তম বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন: “অতএব যে আপন কুমারী কন্যার বিবাহ দেয়, সে ভাল করে; এবং যে না দেয়, সে আরও ভাল করে।” (বাইবেল,নতুন নিয়ম, ১ করিন্থীয় ৭/১-৪০)
ইসলামে এ প্রবণতার কঠোর বিরোধিতা করা হয়েছে। বিভিন্ন হাদীসে বৈরাগ্যকে নিষেধ করা হয়েছে এবং বিবাহ-সংসার করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রসিদ্ধ সাহাবী উসমান ইবনু মাযঊন (রাঃ) এক পর্যায় সংসার পরিত্যাগ করে বৈরাগ্য অবলম্বনের সিদ্ধান্ত নেন। তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“উসমান, আমাকে বৈরাগ্যের নির্দেশ দেওয়া হয়নি, তুমি কি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করছ? তিনি বলেন: না, ইয়া রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! আমি আপনার সুন্নাতকে অপছন্দ করছি না। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন: আমার সুন্নাতের মধ্যে রয়েছে যে, আমি রাতে তাহাজ্জুদ পড়ি আবার ঘুমােই, কখনো নফল সাওম রাখি, কখনো রাখিনা, বিবাহ করি, আবার বিবাহ বিচ্ছেদও করি। যে ব্যক্তি আমার সুন্নাতকে অপছন্দ করবে তার সাথে আমার সম্পর্কে নেই। (দারেমী ২/১৭৯, হাদীসটি সহীহ্)
ইসলামের দৃষ্টিতে শুধু আল্লাহর স্মরণ, প্রার্থনা, যপতপ, যিকর-ওযীফা, নামায-রোযা এগুলিই ইবাদত নয়; উপরন্ত বিবাহ করা, স্ত্রীর সাথে দৈহিক সম্পর্ক স্থাপন করা, খেলাধুলা হাসিতামাশা করা, স্ত্রী-সন্তানদের ভরণপোষণের জন্য কর্ম ও উপার্জন করা সবই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের অন্যতম কর্ম ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। একমাত্র এই বিশ্বজনীন মানবিক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমেই মানব সভ্যতা টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
বিবাহের ক্ষেত্রে সর্ব প্রথম বিষয় হলো পাত্র ও পাত্রী পছন্দ করা। বিভিন্ন যোগ্যতার ভিত্তিতে এই পছন্দ করা। বিভিন্ন যোগ্যতার ভিত্তিতে এই পছন্দ হতে পারে। ইসলামে নৈতিক দৃঢ়তা ও সততা-ধার্মিকতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, পরিবার অর্থেই স্বামী-স্ত্রী উভয়কে উভয়ের জন্য কিছু ত্যাগ করতে হবে, কিছু ছাড় দিতে হবে এবং সন্তানদের জন্য উভয়েরই কিছু ত্যাগ করতে হবে। সাধারণভাবে মানুষ প্রকৃতগতভাবেই এরূপ করেন, তবে পারিবারিক জীবনের সুদীর্ঘ সময়ে অগণিত মুহর্ত আসে যখন একমাত্র ধর্মীয় জীবন এবং নন্তানদের সঠিক প্রতিপালনের জন্য স্বামী-স্ত্রী উভয়ের মধ্যে “তাকওয়া”র গুণটির দিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব আরোপ করতে হবে। পাত্র বা পাত্রপক্ষকে লক্ষ করে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“একজন মেয়েকে চারিটি বিষয়ের পরিপ্রেক্ষিতে বিবাহ করা হয়: তার সম্পদের কারণে, তার বংশমর্যাদার কারণে, তার সৌন্দর্যের কারণে এবং তার ধার্মিকতার কারণে। তুমি ধার্মিক মেয়েকে বেছে নিয়ে সফলতা অর্জন কর।” (সহীহ্ মুসলিম ২/১০৮৬)
বিবাহের ক্ষেত্রে অভিভাবকের মতামতের পাশাপাশি পাত্রী বা কনের মতামতকে পরিপূর্ণ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে ইসলামে। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
“অবিবাহিত বা স্বামী বিহীন মহিলার তার নিজের বিষয়ে তার অভিভাবকের চেয়ে বেশি হকদার। আর কুমারী মেয়েরও গ্রহণ করতে হবে। তার নীরবতাও অনুমতি।” (সহীহ্ মুসলিম ২/১০৩৭)
সাধারণভাবে যৌবনের শুরুতে যুবক-যুবতী সহজেই বয়সের উম্মাদনায় বিভ্রান্ত হয় এবং নিজের চোখের ভাললাগার উপরে নির্ভর করেই সঙ্গী পছন্দ করে। আমরা দেখেছি যে, বিবাহের ক্ষেত্রে চোখের পছন্দের পাশাপাশি ভবিষ্যত জবিন ও আগত প্রজন্মের কল্যাণের কথাও চিন্তা করতে হবে। এজন্য ইসলামে বিবাহের ক্ষেত্রে পাত্রপাত্রীর মতামতের সাথে অভিভাবকদের মতামতেরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
বিবাহের সুন্নাত তরিকা
মোহরানা: পাত্রের উপর ফরয হলো স্ত্রীকে ‘মোহর’ প্রদান করা। বিবাহের ফলে মেয়েকেই স্বামীর ঘরে আসতে হয়। এজন্য স্বামীর পক্ষ থেকে সদিচ্ছা, সচ্ছলতা ও ভালবাসার প্রতীক হলো এই ‘মোহরানা’। কুরআন ও হাদীসে এ বিষয়ে বারংবার মোহরানা প্রদানের নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইরশাদ করেনঃ
وَءَاتُواْ ٱلنِّسَآءَ صَدُقَٰتِهِنَّ نِحۡلَةٗۚ فَإِن طِبۡنَ لَكُمۡ عَن شَيۡءٖ مِّنۡهُ نَفۡسٗا فَكُلُوهُ هَنِيٓٔٗا مَّرِيٓٔٗا-
“আর নারীদেরকে তাদের দেয় মোহর প্রদান কর, কিন্তু যদি তারা সন্তুষ্ট চিত্তে পরে কিয়দংশ প্রদান করে তাহলে সঠিক বিবেচনা মত তৃপ্তির সাথে ভোগ কর।”(সূরা নিসা: ৪)
মোহর একান্তই কনের পাওনা এবং মোহর ধার্য করার জন্য নয়, প্রদান করার জন্য। বিবাহের সময় মোহর দিয়ে দেওয়াই উত্তম। প্রয়োজনে পুরোটা বা আংশিক মোহর বাকি করা জায়েয। স্ত্রীকে মোহর পরিশোধ করার পরে তিনি যদি তার কিছু স্বামকে প্রদান করেন তা ভোগ করা বৈধ। তবে মোহর পরিশোধ না করা বা শুধুমাত্র ধার্য করার জন্য ধার্য করা বৈধ নয়। অনুরূপভাবে পরিশোধ না করে স্ত্রীর কাছে বাসর রাতে বা অন্য কোনো সময়ে মোহরানা মাফ চাওয়াও কোনোভাবে বৈধ নয়। এরূপ মাফ করলেও মাফ হবে না। কারণ আল্লাহ্ বলেছেন যে, পরিশোধের পরে পরিপূর্ণ সন্তুষ্ট চিত্তে যদি তারা স্বামীকে কিছু দেন তবে তা স্বামী ভোগ করতে পারে। পরিশোধের আগে বা চাপ দিয়ে কিছু নেওয়ার সুযোগ নেই। যদি কেউ স্ত্রীর মোহর ও অন্যান্য হক্ক পরিপূর্ণরূপে প্রদানের নিয়্যাত ছাড়া বিবাহ করে এবং স্ত্রীর অধিকার আদায় না করে মৃিত্যুবরণ করে তবে সে ব্যভিচারী হয়ে কিয়ামতে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ করবে বলে হাদীস শরীফ উল্লেখ করা হয়েছে। বাসর রাতে মাফ নেওয়ার নিয়্যাতে মোহর নির্ধারণ করাও এ পর্যায়ের। (আলবানী, সহীহুত তারগীব ২/১৬৭; সদীসটি সহীহ্)
মোহরের পরিমাণ: মোহরের পরিমাণ হবে বর ও কনে উভয়ের আর্থ-সামাজিক অবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। মোহর যেন বরের পক্ষে প্রদান করা সম্ভব এবং কনের সামাজিক সম্মান ও মর্যাদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
আয়েশা (রাঃ) বলেন, “রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর স্ত্রীগণের মোহর ছিল সাড়ে বার উকিয়া রৌপ্য।” (সহীহ্ মুসলিম ২/১০৪২)
আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ফাতিমা (রাঃ)-কে বিবাহ করার সময় তার কাছে কোনো নগদ অর্থ ছিল না। তিনি তাঁর মূল্যবান বর্মটির মূল্য ৪৮০ দিরহাম ছিল বলে জানা যায়। (হাইসামী, মাজমউয যাওয়াই ৪/২৮৩)
৪৮০ দিরহামে ১৭০০ গ্রাম রোপ্য যা তৎকালীন সময়ে ২৪২ গ্রাম স্বর্ণের সমমূল্য ছিল। ৫ উকিয়া বা ৬০০ গ্রাম রোপ্য বা ৮৫ গ্রাম স্বর্ণ হলো যাকাতের নিসাব। ৬০০ গ্রাম রোপ্য বা ৮৫ গ্রাম স্বর্ণের মালিক সে সময়ে ধনী বলে গণ্য ছিলেন। সে সময়ে ১৭০০ গ্রাম রোপ্য বা ২৪২ গ্রাম রৌপ্য বা ২৪২ গ্রাম স্বর্ণ মোহর হিসেবে সম্মানজনক অঙ্ক ছিল।
নবদম্পতির জন্য দু‘আ: নবদম্পতিকে দু‘আ করা সুন্নাত। কারো বিবাহের কথা জানলে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন: بَارَكَ اللهُ لَكَ وبَارَكَ عَليْكَ وَ جَمَعَ بَيْنَكُمَا فِى الْخَيْر “আল্লাহ্ তোমার জন্য বরকত দিন, তোমার উপরে বরকত দিন এবং তোমাদের উভয়কে কল্যাণের মধ্যে একত্রিত রাখুন।” (তিরমিযী ৩/৪০০,সনদ হাসান)
বাসর রাতই দম্পতির জীবনের শ্রেষ্ঠতম আনন্দঘন রাত। মানবীয় প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রেরণায় নবদম্পতি পরস্পরকে আপন করে নেবে। তবে শুরুতেই দুআ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে হাদীস শরীফ। বর তার নববধুর মাথার সম্মুখভাগে হাত রেখে আল্লাহর কাছে নববধুর কল্যাণ কামনা করে এবং সকল অকল্যাণ থেকে আশ্রয় চেয়ে দু‘আ করবে। এছাড়া আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রাঃ) ও অন্যান্য সাহাবী পরামর্শ দিয়েছেন যে, স্বামী নববধুকে পিছনে নিয়ে একত্রে দু রাক‘আত সালাত আদায় করে আল্লাহর কাছে সম্প্রীতি, বরকত ও কল্যাণের জন্য দোয়া করবে।
ওলীমা: বিবাহ পরবর্তী অন্যতম বিষয় হলো ওলীমা। আমাদের দেশে ‘বৌ-ভাত’ নামে অনষ্ঠান করা হয় এবং তাতে নববধুকে সাজিয়ে রাখা হয়। এতে ইসলামের পর্দার ফরয বিধানকে নগ্নভাবে পদদলিত করা হয়। ইসলামী ওলীমা বৌ প্রদশনী নয়। ওলীমা হলো নববধুর আগমন উপলক্ষে তার সম্মানে বর কর্তৃক তার আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুদেরকে পানাহারের মাধ্যমে আপ্যায়ন করা ও আনন্দে শরীক করা। সাধ ও সাধ্যের সমন্বয়েই ওলীমা হবে। তবে ওলীমার ক্ষেত্রে শুধু ধনী মানুষদের দাওয়াত দেওয়া ও গরীবদের বাদ দেওয়াকে হাদীস শরীফে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।
হাদসে ওলীমার জন্য বরকে বিশেষভাবে নির্দেশ দেওয়া। এজন্য অনেক ফকীহ্ ওলীমা ওয়াজিব বলেছেন। তবে অধিকাংশ ফকীহ্ ওলীমা সুন্নাত বলে উল্লেখ করেছেন।
বুরাইদা (রা) বলেন, “যখন আলী (রা) ফাতেমা (রা)কে বিবাহ করার প্রস্তাব দিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বিবাহ উপলক্ষে বা কনের আগমন উপলক্ষ্যে একটি ওলীমা করা অত্যাবশ্যক। তখন সা‘দ (রা) বলেন, আমি একটি ভেড়া প্রদানের দায়িত্ব গ্রহণ করলাম। আরেক জন বলেন, আমি এই পরিমাণ ভুট্টা প্রদান করব।…।” (হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ৪/৪৯, ৯/২০৯)
এ হাদীস থেকে ওলীমার গুরুত্ব ছাড়াও আমরা জানতে পারছি যে, প্রয়োজনে পাত্রকে ওলীমার আয়োজনে মাংস, খাদ্য ও আর্থিক সাহায্য করা পাত্রের আত্মীয়ও বন্ধুদের জন্য একটি সুুন্নাত সম্মত দায়িত্ব।
মোহর প্রদান ও ওলীমা করা উভয়ই পাত্র বা বরের দায়িত্ব। বিবাহে কনে বা কনের পিতার কোনো আর্থিক দায়ভার নেই। কনে পিতা ইচ্ছা করলে মেয়েকে কিছু হাদীয়া দিতে পারেন। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফাতেমাকে (রা) যখন আলীর (রা) ঘরে প্রেরণ করেন তখন তার সাথে একটি মোটা চাদর, একটি তাকিয় জাতীয় গদি এবং একটি পানির পাত্র প্রদান করেন বলে হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। (বাইহাকী,শুআবুল ঈমান ৭/৩১৭)
যা করা যাবে না: বিবাহ উপলক্ষে আমাদের সমাজে নানান অনৈইসলামিক রীতি চালু রয়েছে। যেমন, যৌতুক গ্রহণ, রং, হলুদ, গান, গীত, নাচ ইত্যাদি। এছাড়াও ঘটা করে বড় অনুষ্ঠান তাও আবার পাত্রীপক্ষকে একরকম বাধ্য করে করা হয়। এসব অবশ্যই পরিত্যাজ্য। উল্লেখ্য, বিয়েতে আরেকটি বড় ভুল হলো উকিল বাবা দাঁড় করানো। এটার স্থান ইসলামী শরীয়তে নেই। এটা হতে পারে বাবা বেঁচে নেই এমন পরিস্থিতিতে। তবে এক্ষেত্রে এ দায়িত্ব বড় ভাই, চাচা, মামা বা যেকেউ হতে পারে। এছাড়াও বিয়ের পর বিভিন্ন রীতি-রেওয়াজ মানার নিয়ম চালু আছে এসবের স্থানও ইসলামে নেই।
যৌতুক: বিবাহ উপলক্ষে যে কোনোভাবে কনের পিতার নিকট থেকে বা কনের নিকট থেকে দাবি করে বা চাপ দিয়ে কোনোরূপ আর্থিক সুবিধা বা উপহার গ্রহণ করাই যৌতুক, যা ইসলামে নিষিদ্ধ জুলুম ও অবৈধ উপার্জনের অন্যতম। এমনকি কনের পিতার ইচ্ছার অতিরিক্ত বরযাত্রী যাওয়া, বরযাত্রীদেরকে আপ্যায়নের ক্ষেত্রে বিশেষ খাবারের দাবি করা বা অনুরূপ সকল দাবিও জুলুম ও যৌতুকের অংশ।
বিবাহ অনুষ্ঠান: বিবাহ উপলক্ষে হৈহৈ রৈরৈ কান্ড, নাচ, গান ইত্যাদি অবশ্যই নাজায়েয-হারাম কাজ। এছাড়াও এটা অশ্লীলতা, বেপর্দা ও অপচয়। পাশ্চাত্য ও ভারতীয় সাংস্কৃতির আগ্রাসনে আজ আমাদের সমাজের অধিকাংশ বিবাহই হচ্ছে কঠিন পাপ-পঙ্কিলতার মধ্য দিয়ে। আমরা দেখেছি যে, আল্লাহ্ পর্দা ফরয করেছেন এবং একজন মহিলার জন্য মাথা, চুল, কান, ঘাড়, গলা বা দেহের অন্য কোনো অংশ অনাবৃত করে বাইরে বা অনাত্মীয় বা দূরাত্মীয়দের সামনে যাওয়া ব্যভিচারের মতই কঠিনতম কবীরা গোনাহ। অথচ মুসলিম পরিবারগুলির বিবাহে মহিলারা দেহ ও শাড়ি-গহনা প্রদর্শনের ভয়ঙ্কর প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হন। সম্পূর্ণ বেপর্দাভাবে বরকনেকে মিষ্টি খাওয়ানো, গান-বাজনা, ব্যান্ড শো, ভিডিও ফিল্ম তৈরি ইত্যাদি কঠিন হারামকাজগুলি একসাথে আমরা করি। অনেক দীনদার মানুষ বা পর্দানশীন মহিলাও এ সব অনুষ্ঠানে এরূপ কঠিনতম হারাম কাজে লিপ্ত হন। দেখে মনে হয়, মুসলিমরা এদিনের জন্য আল্লাহর সাথে বিদ্রোহ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বিবাহ একটি ইবাদত। কিন্তু অনৈসলামিকভাবে তা সম্পন্ন হলে কিভাবে তা থেকে বরকত বা সফলতা লাভ করা যেতে পারে?
আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা ইরশাদ করেনঃ
إِنَّ ٱلَّذِينَ يُحِبُّونَ أَن تَشِيعَ ٱلۡفَٰحِشَةُ فِي ٱلَّذِينَ ءَامَنُواْ لَهُمۡ عَذَابٌ أَلِيمٞ فِي ٱلدُّنۡيَا وَٱلۡأٓخِرَةِۚ..
“যারা পছন্দ করে যে, মুমিনদের মধ্যে অশ্লীলতার প্রসার ঘটুক তাদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি দুনিয়াতে এবং আখিরাতে।” (সূরা নূর: ১৯)
আমরা যারা এরূপ ভয়ঙ্কর অশ্লীলতার প্রসারের মাধ্যমে নিজেদের বা নিজ সন্তানদের দাম্পত্য জীবন শুরু করলাম, আমরা কিভাবে ভাবতে পারি যে, আমাদের এ দাম্পত্য জীবনে কোনো না কোনো ভাবে এ যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি নেমে আসবে না। আল্লাহ্ তাঁর ওয়াদা ভঙ্গ করেন না। পরিবার মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের অন্যতম ঠিকানা। পরিবারের শুরু বিবাহের মাধ্যমে। বাকী জীবনের সকল ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর রহমত, বরকত ও তাওফীক লাভের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই বিবাহকে সকল প্রকার পাপ, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, জুলুম ও যৌতুক থেকে হেফাযত করতে হবে। সাময়িক স্বার্থের কারণে এ সকল পাপ দিয়ে বিবাহ শুরু করলে দম্পতির পরবর্তী জীবন সফলতার আশা করা বাতুলতা। কোনো বিবাহ বা ওলীমা অনুষ্ঠানে এরূপ শরীয়ত বিরোধী বা হারাম কর্ম হল সে অনুষ্ঠানে যোগ না দিতে এবং সাধ্যমত প্রতিবাদ করতে নির্দেশ দিয়েছেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম। আল্লাহ্ আমাদেরকে হেফাযত করুন। আ-মী-ন।
Visit Our English Site : Click Here
Thanks for reading. جزاك الله خيرا