রাসূলকে (ছাঃ) মান্য করার অপরিহার্যতা-change your life, be a better person
আল্লাহ্ সুবহানাহু ইরশাদ করেনঃ
وَمَآ أَرۡسَلۡنَا مِن رَّسُولٍ إِلَّا لِيُطَاعَ بِإِذۡنِ ٱللَّهِۚ وَلَوۡ أَنَّهُمۡ إِذ ظَّلَمُوٓاْ أَنفُسَهُمۡ جَآءُوكَ فَٱسۡتَغۡفَرُواْ ٱللَّهَ وَٱسۡتَغۡفَرَ لَهُمُ ٱلرَّسُولُ لَوَجَدُواْ ٱللَّهَ تَوَّابٗا رَّحِيمٗا-
“আমি এতদ্ব্যতীত কোনই রাসূল প্রেরণ করিনি যে, আল্লাহর আদেশে তাঁর আনুগত্য স্বীকার করবে, এবং যদি তারা স্বীয় জীবনের উপর অত্যাচার করার পর তোমার নিকট আগমন করত, অতঃপর আল্লাহর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করত আর রাসূলও তাদের জন্য আল্লাহর নিকট ক্ষমা চাইত তাহলে নিশ্চয়ই তারা আল্লাহকে তাওবাহ কবূলকারী, করুণাময় দেখতে পেত।” (সূরা নিসা : ৬৪)
ভাবার্থ এই যে, প্রত্যেক যুগের রাসূলের আনুগত্য স্বীকার করা তাঁর উম্মাতের উপর আল্লাহ্ তা‘আলার পক্ষ হতে ফারয হয়ে থাকে। রিসালাতের পদমর্যাদা এই যে, তাঁর সমস্ত আদেশকে আল্লাহ্ তা‘আলার আদেশ মনে করা হবে। (তাবারী ৮/৫১৬) অর্থাৎ আল্লাহর ক্ষমতা ও ইচ্ছা ছাড়া কেউ তাঁর আনুগত্য স্বীকার করতে পারেনা। যেমন অন্য আয়াতে রয়েছে إِذۡ تَحُسُّونَهُم بِإِذۡنِهِۦۖ ‘যখন তুমি তাঁর হুকুমে তাদের উপর জয়যুক্ত হয়েছিলে’ (সূরা আলে ইমরান : ১৫২) এখানেও إِذۡنِ শব্দের ভাবার্থ হচ্ছে তাঁর ক্ষমতা ও ইচ্ছা।
অতঃপর আল্লাহ্ তা‘আলা অবাধ্য ও পাপীদের প্রতি ইরশাদ করছেন যে, তারা যেন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট আগমন করে আল্লাহ্ তা‘আলার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে এবং রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটও যেন তাদের জন্য আল্লাহ্ তা‘আলার নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করার আবেদন জানায়। তারা যখন এরূপ করবে তখন নিশ্চয়ই আল্লাহ্ তা‘আলা তাদের তাওবাহ্ কবূল করবেন এবং তাদের প্রতি দয়া পরবশ হয়ে তাদেরকে ক্ষমা করে দিবেন। এ জন্যই আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
لَوَجَدُواْ ٱللَّهَ تَوَّابٗا رَّحِيمٗا-
তাহলে নিশ্চয়ই তারা আল্লাহকে তাওবাহ্ কবূলকারী ও করুণাময় হিসাবে পেত। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
কোন ব্যক্তি মু‘মিন হতে পারেনা যতক্ষণ না সে বিচারের ভার রাসূলের (ছাঃ) উপর অর্পণ করে
আল্লাহ্ সুব্হানাহু ওয়া তা‘আলা ইরশাদ করেনঃ
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ ثُمَّ لَا يَجِدُواْ فِيٓ أَنفُسِهِمۡ حَرَجٗا مِّمَّا قَضَيۡتَ وَيُسَلِّمُواْ تَسۡلِيمٗا-
“অতএব তোমার রবের শপথ! তারা কখনই বিশ্বাস স্থাপনকারী হতে পারবেনা, যে পর্যন্ত তোমাকে তাদের সৃষ্ট বিরোধের বিচারক না করে, অতঃপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করে এবং ওটা সন্তুষ্ট চিত্তে কবূল না করে।
অত্র আয়াতে কারীমায় আল্লাহ্ তা‘আলা স্বীয় পবিত্র ও সম্মানিত সত্তার শপথ করে বলেছেনঃ ‘কোন ব্যক্তিই ঈমানের সীমার মধ্যে আসতে পারেনা যে পর্যন্ত সমস্ত বিষয়ে আল্লাহ তা‘আলার শেষ নাবীকে ন্যায় বিচারক রূপে মেনে না নিবে এবং প্রত্যেক নির্দেশকে, প্রত্যেক মীমাংসাকে, প্রত্যেক সুন্নাতকে,প্রত্যেক (সহীহ) হাদীসকে গ্রহণযোগ্য রূপে স্বীকার না করবে। আর অন্তর ও দেহকে একমাত্র ঐ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামেরই আনুগত্য না করবে।’ মোট কথা, যে ব্যক্তি তার প্রকাশ্য, গোপনীয়, ছোট ও বড় প্রতিটি বিষয়ে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের হাদীসকে সমস্ত নীতির মূল মনে করবে সে হচ্ছে মু‘মিন। অতএব নির্দেশ দেয়া হচ্ছে, তারা যেন তোমার মীমাংসাকে সন্তুষ্ট চিত্তে মেনে নেয় এবং স্বীয় অন্তরে যেন কোন প্রকারের সংকীর্ণতা পোষণ না করে। তারা যেন সমস্ত হাদীসকেই স্বীকার করে নেয়। তারা যেন হাদীসসমূহকে স্বীকার করা হতে বিরত না থাকে। যেমন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ঘোষণা করেনঃ ‘যাঁর অধিকারে আমার প্রাণ তাঁর শপথ! তোমাদের মধ্যে কেহ মু‘মিন হতে পারেনা যে পর্যন্ত না সে স্বীয় প্রবৃত্তিকে ঐ বিষয়ের অনুগত করে যা আমি আনয়ন করেছি।’
সহীহ্ বুখারীতে উরওয়াহ (রাঃ) হতে বর্ণিত আছে যে, তিনি বলেন যে, নালা দিয়ে বাগানে পানি নেয়ার ব্যাপারে একটি লোকের সঙ্গে যুবাইরের (রাঃ) বিবাদ হয়। নাবী রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন বলেনঃ ‘হে যুবাইর! তোমার বাগানে পানি নেয়ার পর তুমি আনসারীর বাগানে পানি যেতে দাও।’ তাঁর এ কথা শুনে আনসারী বলে, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! সে আপনার ফুপাতো ভাই তো!’ এটা শুনে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখমন্ডলের বর্ণ পরিবর্তিত হয় এবং তিনি বলেনঃ ‘হে যুবাইর (রাঃ)! তুমি তোমার বাগানে পানি দেয়ার পর তা বন্ধ রেখ যে পর্যন্ত না সে পানি বাগানের প্রাচীর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। অতঃপর পানি তোমার প্রতিবেশীর দিকে ছেড়ে দাও।’ প্রথমে রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন পন্থা বের করেন যাতে যুবাইরের (রাঃ) কষ্ট না হয় এবং আনসারীরও প্রশস্ততা বেড়ে যায়। কিন্তু আনসারী যখন সেটা তার পক্ষে উত্তম মনে করলনা, তখন তিনি যুবাইরকে (রাঃ) তার পূর্ণ হক প্রদান করলেন। যুবাইর (রাঃ) বলেন, আমি ধারণা করি যে, فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ এ আয়াতটি এ ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়। (ফাতহুল বারী ৮/১০৩)
আরেক বর্ণনায় রয়েছে, হাফিয আবূ ইসহাক ইবরাহীম ইব্ন আব্দুর রাহমান ইব্ন ইবরাহীম ইব্ন দুহাইন (রহঃ) বর্ণনা করেন যে, দামরাহ (রহঃ) বলেছেনঃ দু’ব্যক্তি তাদের বিবাদের মীমাংসার জন্য মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সালামের দরবারে উপস্থিত হয়। তিনি একটা মীমাংসা করে দেয়। যে ব্যক্তি প্রতিকূলে বিচারের মীমাংসা চলে যায় সে বললঃ চল, আমরা আবূ বাকরের (রাঃ) কাছে যিই। আবূ বাকরের (রাঃ) কাছে যাওয়ার পর যে ব্যক্তির পক্ষে ফাইসালা দেয়া হয়েছিল সে বললঃ আমরা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে আমাদের বিরোধ মীমাংসার জন্য গিয়েছিলাম এবং তিনি যে ফাইসালা দিয়েছেন তা আমার পক্ষে যায়। তখন আবূ বাকর (রাঃ) বললেনঃ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম যে ফাইসালা দিয়েছেন আমার তরফ থেকেও ঐ একই ফাইসালা।
যে ব্যক্তি মীমাংসায় হেরে যায় সে বললঃ চল, আমরা উমার ইব্ন খাত্তাবের (রাঃ) কাছে যাই। তারা এখানে এলে যার অনুকূলে ফাইসালা হয়েছিল সে সমস্ত ঘটনা উমারের (রাঃ) নিকট বর্ণনা করে। উমার (রাঃ) তখন তাদেরকে বলেন, ‘এখানে তোমরা থাম আমি এসে ফাইসালা করছি।’ তিনি তরবারী নিয়ে এলেন এবং যে ব্যক্তি বলেছিল, ‘আমাদেরকে উমারের (রাঃ) নিকট পাঠিয়ে দিন’ তিনি তাকে হত্যা করেন। এর প্রেক্ষিতেই فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤۡمِنُونَ حَتَّىٰ يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيۡنَهُمۡ এ আয়াতটি নাযিল হয়। (দুররুল মানসুর ২/৩২২)
আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলকে মান্য করার পুরস্কার
মহান আল্লাহ ইরশাদ করেনঃ
وَمَن يُطِعِ ٱللَّهَ وَٱلرَّسُولَ فَأُوْلَٰٓئِكَ مَعَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّۧنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّٰلِحِينَۚ وَحَسُنَ أُوْلَٰٓئِكَ رَفِيقٗا-
“আর যে কেহ আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, তারা ঐ ব্যক্তিদের সঙ্গী হবে যাদের প্রতি আল্লাহ্ অনুগ্রহ করেছেন; অর্থাৎ নাবীগণ, সত্য সাধকগণ, শহীদগণ ও সৎ কর্মশীলগণ; এবং এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী।
যে ব্যক্তি রাসূলের নির্দেশের উপর আমল করে এবং নিষিদ্ধ কাজ হতে বিরত থাকে তাকে আল্লাহ্ তা‘আলা সম্মানের ঘরে (জান্নাতে) নিয়ে যাবেন এবং নাবীগণের বন্ধুরূপে পরিগণিত করবেন। তারপর সত্য সাধকদের বন্ধু করবেন, যাদের মর্যাদা নাবীগণের পরে। তারপর তাদেরকে তিনি শহীদের সঙ্গী করবেন। অতঃপর সমস্ত মু‘মিনের সঙ্গী করবেন যাদের ভিতর ও বাহির সুসজ্জিত। একটু চিন্তা করলেই বুঝা যাবে যে, এঁরা কতই না পবিত্র ও উত্তম বন্ধু! (তাফসীর ইবনে কাসীর)
সহীহ্ বুখারীতে রয়েছে, আয়িশা (রাঃ) বলেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ ‘প্রত্যেক নাবীকে (আঃ) তার রোগাক্রান্ত অবস্থায় দুনিয়ায় অবস্থানের এবং আখিরাতের দিকে গমনের মধ্যে অধিকার দেয়া হয়।’ যখন রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহ্ ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম রোগাক্রান্ত হন, যে রোগ হতে তিনি আর সেরে উঠতে পারিননি তখন তাঁর কন্ঠস্বর বসে যায়। সেসময় আমি তাঁকে বলতে শুনি, مَعَ ٱلَّذِينَ أَنۡعَمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِم مِّنَ ٱلنَّبِيِّۧنَ وَٱلصِّدِّيقِينَ وَٱلشُّهَدَآءِ وَٱلصَّٰلِحِينَۚ তাদের সঙ্গে যাঁদের উপর আল্লাহ্ তা‘আলা অনুগ্রহ করেছেন, যারা নাবী, সত্য সাধক, শহীদ ও সৎকর্মশীল। আমি তখন জানতে পারি যে, তাঁকে অধিকার দেয়া হয়েছে। (ফাতহুল বারী ৮/১০৩,মুসলিম ৪/১৮৯৩)
অন্য হাদীসে রয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সালাম তাঁর মৃত্যুর পূর্বে বলেছিলেনঃ اَللَّهُمَ اغْفِرلِى وَارْحَمْنِي وَالْحِقْنِي بِالرفِيقِ الأَعْلَى “হে আল্লাহ্! আমার পাপ ক্ষমা করে দাও, আমার উপর রহম কর এবং আমাকে শ্রেষ্ঠ বন্ধুর সাথে মিলিয়ে দাও।” (সহীহ্ মুসলিম ৪/১৮৯৪)
Visit Our English Site : Click Here
Thanks for reading. جزاك الله خيرا