ইসলাম ভঙ্গের কারণসমূহ
আমাদের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ইসলাম। ইসলাম ব্যতীত আমাদের জীবন একেবারেই গুরুত্বহীন। কেননা ইসলাম না থাকাবস্থায় আমরা যত উত্তম আমলই করি না কেন আল্লাহ তা‘আলার কাছে তা গ্রহণযোগ্য নয়, সেটির প্রতিদান পাওয়াও সম্ভব নয়। সুতরাং আমাদের উত্তম আমলসমূহের যথাযথ প্রতিদান পেতে হলে সর্বপ্রথম আমাদের ইসলামকে ঠিক রাখা আবশ্যক। আর ইসলামকে ঠিক রাখতে হলে আমাদেরকে জানতে হবে যে, কী কী কারণে ইসলাম ভঙ্গ হয়ে যায়। আল কুরআন ও সহীহ্ হাদীসেরে আলোকে আলিমগণ মতামত পোষণ করেছেন যে, ১০টি কারণে যে কোন ব্যক্তির ইসলাম ভঙ্গ হয়ে যায়। আসুন উক্ত ১০টি কারণ আমরা সংক্ষেপে জানার চেষ্টা করি ও সেগুলি থেকে বেঁচে থাকার চেষ্টা করি।
ইসলাম ভঙ্গের প্রথম কারণ
আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে অংশীদার স্থাপন করা অথবা আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে সমকক্ষ দাঁড় করানো- চাই সেটা ইবাদাতের ক্ষেত্রে হোক অথবা প্রার্থনার ক্ষেত্রে অথবা ভয়-ভীতির ক্ষেত্রে অথবা ভালোবাসার ক্ষেত্রে অথবা আনুগত্যের ক্ষেত্রে অথবা অন্যান্য যে কোন ক্ষেত্রেই হোক না কেন। এ ক্ষেত্রে মূলনীতিটি হচ্ছে, যেসব বিষয় শুধুমাত্র আল্লাহর জন্যই জন্যই নির্দিষ্ট, সেসব বিষয়ে তাঁর সাথে অন্য কাউকে শরীক করলে ব্যক্তির ঈমান নষ্ট হয়ে যাবে এবং সে মুশরিক হিসেবে গণ্য হবে। এদের ব্যাপারে আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
إِنَّهُۥ مَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدۡ حَرَّمَ ٱللَّهُ عَلَيۡهِ ٱلۡجَنَّةَ وَمَأۡوَىٰهُ ٱلنَّارُۖ وَمَا لِلظَّٰلِمِينَ مِنۡ أَنصَارٖ-
“যে আল্লাহর সাথে শরীক করে আল্লাহ্ অবশ্যই তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন। (ফলে) তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালিমদের জন্য কোন সাহায্যকারী নেই। (সূরা মায়েদা : ৭২)
আল্লাহ তা‘আলা আরো বলেন,
إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَغۡفِرُ أَن يُشۡرَكَ بِهِۦ وَيَغۡفِرُ مَا دُونَ ذَٰلِكَ لِمَن يَشَآءُۚ وَمَن يُشۡرِكۡ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱفۡتَرَىٰٓ إِثۡمًا عَظِيمًا-
“নিশ্চয় আল্লাহ তাঁর সঙ্গে শরীক করার গুনাহ (একনিষ্ঠ তাওবা ব্যতীত) ক্ষমা করেন না; তবে এটা ছাড়া অন্যান্য গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে দেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে শরীক করল, সে তো মহাপাপে জড়িয়ে মিথ্যা রচনা করল। (সূরা নিসা : ৪৮)
আল্লাহ এবং তাঁর বান্দার মাঝখানে কোন মাধ্যম স্থির করা
এরূপ মনে করা যে, আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করার জন্য অথবা নিজের গোনাহ মাফের জন্য সরাসরি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করাটা যথেষ্ট নয়; বরং এ কাজের জন্য এমন কোন সুপারিশকারী, পীর, ওলী, দেব-মূর্তী বা এই ধরণের কিছু প্রয়োজন রয়েছে, যাকে/যাদেরকে সন্তুষ্ট করলতে পারলে তারা আল্লাহর নিকট তার ব্যাপারে সুপারিশ করবেন এবং আল্লাহ্ তা‘আলা তার সুপারিশ কবুল করবেন। আল্লাহর ব্যাপারে এরূপ ধারণা পোষণ করলে নিঃসন্দেহে ব্যক্তির ইসলাম ভঙ্গ হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ
“আল্লাহর অনুমতি ব্যতীত এমন কে আছে, যে তাঁর নিকট সুপারিশ করতে পারে?” (সূরা বাকারা : ২৫৫)
مَن ذَا ٱلَّذِي يَشۡفَعُ عِندَهُۥٓ إِلَّا بِإِذۡنِهِۦۚ
ইসলাম ভঙ্গের তৃতীয় কারণ
কাফিরদেরকে কাফির মনে না করা
যার কাফের হওয়ার ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহ ঐক্যমত পোষণ করেছেন, তার কুফরীর ব্যাপারে মুসলিম উম্মাহর কোন দ্বিমত নেই। তাই কোন কোন মুসলিম এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণ করলে অথবা তাদেরকে কাফির হিসেবে সাব্যস্ত করার ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করলে সে নিজেই কুফরী মতবাদে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। অনুরূপভাবে কেউ যদি এরূপ বিশ্বাস স্থাপন করে যে, ইহুদী-খ্রিস্টান-ইসলাম এই তিন ধর্মই সঠিক ও সত্য; প্রতিটি ধর্মই তার অনুসারীকে আল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছায়; তাই যার যে ধর্ম পছন্দ হয়, সে তা গ্রহণ করতে পারে, তাতে কোন অসুবিধা নেই, তাহলে তারও ইসলাম ভঙ্গ হয়ে যাবে।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَمَن يَكۡفُرۡ بِٱلطَّٰغُوتِ وَيُؤۡمِنۢ بِٱللَّهِ فَقَدِ ٱسۡتَمۡسَكَ بِٱلۡعُرۡوَةِ ٱلۡوُثۡقَىٰ
“সুতরাং যে তাগুতকে অস্বীকার করবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে সে এমন এক মজবুত রশি ধারণ করল, যা কখনো ছিঁড়বে না।” (সূরা বাকারা : ২৫৬)
ইসলামের কোন বিষয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ থেকে যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন সেই দ্বীন সম্পর্কে অথবা দ্বীনের কোন বিষয় নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করা। এরূপ করাটা মূলত কাফেরদের একটি বিশেষ স্বভাব। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর যুগের কাফিররাও মুসলিমদের সাথে এরূপ ব্যবহার করত।
ইসলাম ভঙ্গের পঞ্চম কারণ
যাদু বা মন্ত্রের মাধ্যমে কারো কল্যাণ অথবা অকল্যাণ করার চেষ্টা করা। এটি দুইভাবে হতে পারে: (১) এমন কিছু আমলের মাধ্যমে, যা মানুষের দেহ অথবা মনের ভেতর প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। যাতে মানুষ অসুস্থ হয়, মরে যায় অথবা মানসিক রোগে আক্রান্ত হয় অথবা কোন কাজ করে ভুলে যায়। এরূপ যাদুকে হাক্বীক্বী যাদু বলা হয়। রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এ প্রকারের যাদু করা হয়েছিল। (২) এমন কিছু আমলের মাধ্যমে, যে যাদু চোখ এবং দৃষ্টিশক্তির উপর প্রভাব ফেলে। যার কারণে কোন বস্তুকে বাস্তবতার বিপরীত দেখা যায়। ফিরআনের যাদুকররা মুসা (আ) এর সাথে এ প্রকারের যাদু করেছিল।
ইসলাম ভঙ্গের ষষ্ঠ কারণ
কাফির-মুশরিকদেরকে সহযোগিতা করা
মুসলিমদের বিরুদ্ধে কাফের-মুশরিকদের পক্ষ নেয়া এবং তাদেরকে সহযোগিতা করা। যদি কোন ব্যক্তি অপর কারো কুফরী কর্মে সহযোগিতা করে আর যদি সেই কুফরী কর্মটি এমন হয় যে, সেটি মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়, তাহলে উক্ত কুফরী কর্মে সহযোগিতা করার কারণেও যে কোন মুসলিম ব্যক্তি ইসলাম থেকে বের হয়ে হয়ে যাবে। ফলে সে মরতাদ হিসেবে পরিগণিত হবে এবং তার উপর মুরতাদের বিধান প্রযোজ্য হবে। মুনাফিক নেতা আব্দুল্লাহ ইবনে উবাই এবং তার সহযোগীরা এই পদ্ধতিতেই ইসলাম থেকে বের হয়ে গিয়েছিল। তারা মৌখিকভাবে ঈমানের স্বীকৃতি দিলেও কার্যক্রমে সর্বদা কাফের-মুশরিকদের পক্ষ অবলম্বন করত এবং তাদেরকে সহযোহগতা করত।
ইসলাম ভঙ্গের সপ্তম কারণ
মুহাম্মদ (ছাঃ) কর্তৃক আনীত জীবনব্যবস্থার কোন বিষয়কে অপছন্দ করা
রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ হতে যে দ্বীন নিয়ে এসেছেন সেই দ্বীনকে বা দ্বীনের কোন বিষয়কে অপছন্দ করা। যেমন- এ বিশ্বাস পোষণ করা যে, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আদর্শের চেয়ে অন্য কোন ব্যক্তির মতাদর্শ উত্তম বা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনীত জীবনব্যবস্থার চেয়ে অন্য কোন ধর্ম বা মতবাদ ভাল অথবা এরূপ মন্তব্য করা যে, ইসলাম একটি পুরাতন ধর্মবিশ্বাস; বর্তমান যুগের জন্য এর বিধি-বিধানসমূহ উপযুক্ত নয়। এই যুগের জন্য চলমান তন্ত্রসমূহই ভালো। -এধরণের বিশ্বাস ও মন্তব্যের কারণে ইসলাম ভেঙ্গে যায়।
ইসলাম ভঙ্গের অষ্টম কারণ
কাউকে আল্লাহর ভালোবাসার ন্যায় ভালোবাসা
পৃথিবীর অন্যান্য বিষয় বা বস্তুর ক্ষেত্রে যেরূপ ভালোবাসা প্রদর্শন করা হয়, আল্লাহর ক্ষেত্রেও অনুরূপ বা তার থেকেও কম ভালোবাসা প্রদর্শন করা অথবা আল্লাহকে যতটুকু পরিমাণ ভালোবাসা উচিত, অন্য কোন বিষয় বা স্তুকে ততটুকু পরিমাণ ভালোবাসা।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
وَمِنَ ٱلنَّاسِ مَن يَتَّخِذُ مِن دُونِ ٱللَّهِ أَندَادٗا يُحِبُّونَهُمۡ كَحُبِّ ٱللَّهِۖ
“মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ এমনও রয়েছে, যারা আল্লাহর পরিবর্তে অন্য কিছুকে তাঁর সমকক্ষ হিসেবে গ্রহণ করে। তারা তাদেরকে তেমনি ভালোবাসে যেমনটি কেবল আল্লাহকেই ভালোবাসা উচিত। আর যারা (সত্যিকার অর্থে) আল্লাহর ওপর ঈমান আনয়ন করে, তারা তো তাঁকেই সর্বাধিক ভালোবাসবে।” (সূরা বাক্বারা : ১৬৫)
ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন জীবনব্যবস্থাকে উত্তম মনে করা
মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর পক্ষ হতে যে জীবনব্যবস্থা নিয়ে এসেছেন তার পরিবর্তে অন্য কোন জীবনব্যবস্থাকে উত্তম মনে করা। যেমন- গণতন্ত্র, রাজতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ইহুদীবাদ, খ্রিস্টবাদ, হিন্দুত্ববাদ ইত্যাদি। অতএব যদি কোন ব্যক্তি মৌখিকভাবে দাবি করে যে, “আমি মুসলিম” অথচ সে ভালো মনে করে উল্লেখিত তন্ত্রমন্ত্রকে তবে তার ইসলাম অটুট থাকবে না, বরং ভেঙ্গে যাবে।
ইসলাম ভঙ্গের দশম কারণ
আল্লাহর দ্বীন থেকে বিমুখ হওয়া
আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদেরকে দুনিয়াতে যে দ্বীন তথা জীবনবিধান দান করেছেন, সেই জীবনবিধান থেকে বিমুখ হয়ে যাওয়া অথবা এর কোন একটি আইনের বিরোধিতা করা। এটি হচ্ছে কোন ব্যক্তির ইসলাম ভঙ্গ হওয়ার একটি বিশেষ কারণ।
(বিষয়টি আরো বিস্তারিত জানতে দেখুন: শাইখ আব্দুর রহমান বিন মুবারক আলী প্রণীত পুস্তক “ইসলাম ভঙ্গের ১০টি কারণ”)
আল্লাহ্ তা‘আলা আমাদের সবাইকে এসব কুফরী থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করুন। আ-মী-ন।
Thanks for reading. جزاك الله خيرا