ইসলামের দৃষ্টিতে ভালোবাসা দিবস-Valentines Day to the Eye of Islam




-জালালুদ্দীন বিন নাজির হোসেন


১৪ ফেব্রুয়ারি সাধু ভ্যালেন্টাইন দিবস বর্তমানে ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবস’ নামে ব্যাপক উদ্দীপনার সাথে আমাদের দেশসহ বিশ্বের প্রায় সর্বত্রে পালিত হয়। মূলত দিবসটি ছিল প্রাচীন ইরোপীয় গ্রীক-রোমানপৌত্তলিকদের একটি ধর্মীয় দিবস। ভারতীয় আর্যদের মতই প্রাচীন রোমান পৌত্তলিকগণ মধ্য ফেব্রুয়ারি বা ১লা ফাল্গুন ভূমি ও নারী উর্বরতা এবং নারীদের বিবাহ ও সন্তান কামনায় প্রাচীন দেবদেবীদের বর লাভ ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে বিভিন্ন নগ্ন ও অশ্লীল উৎসব পালন করত, যা লুপারকালিয়া (Lupercalia) উৎসব (feast of Lupercalis) নামে প্রচলিত ছিল। ইউরোপে খৃস্টান ধর্মের প্রতিষ্ঠা ও রাষ্ট্রধর্মের মর্যাদা লাভের পরেও এ সকল অশ্লীল উৎসব অব্যাহত থাকে। পরে একে ‘খৃস্টীয়’ রূপ দেওয়া হয়। ইউরোপে খৃস্টান ধর্মের প্রতিষ্ঠার পরে ধর্মের নামে, বিশ্বাসের নামে, ডাইনী শিকারের নামে, অবিশ্বাস বা ধর্মীয় ভিন্নমতের অভিযোগে লক্ষ লক্ষ মানুষকে হত্যা ও আগুনে পুড়িয়ে মারা হলেও বিভিন্ন প্রকারের অশ্লীলতা পাপাচার মূর্তিপূজা, সাধুপূজা ইত্যাদির প্রশ্রয় দেওয়া হয়েছে।

বস্তুত ঈসা (আ)-এর প্রস্থানের কয়েক বৎসর পরে শৌল নামক এক ইহুদী- যিনি পৌল নাম ধারণ করেন; তাঁর ধর্ম ও শরীয়তকে বিকৃত করেন। শৌল প্রথমে ঈসা (আ)-এর প্রতি যারা ঈমান এনেছিলেন তাদের উপর কঠিন অত্যাচার করতেন। এরপর হঠাৎ তিনি দাবি করেন যে, যীশু (ঈসা (আ)) তাকে দেখা দিয়েছেন এবং তাকে ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব দিয়েছেন। ফিলিস্তিনে ঈসা (আ)-এর মূল অনুসারীরা তার বিষয়ে সন্দেহ করার কারণে তিনি এশিয়া মাইনর ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যেয়ে খৃস্টান ধর্ম প্রচার করেন। বর্তমানে প্রচলিত খৃস্টান ধর্মের তিনিই প্রতিষ্ঠাতা। এ ধর্মের মূলনীতি হলো, ঈশ্বরের মর্যাদা রক্ষার জন্য যত খুশি মিথ্যা বল। প্রয়োজন মত যত ইচ্ছা পরিবর্তন, পরিবর্ধন করে এবং মিথ্যা বলে মানুষকে ‘খৃস্টান’ বানাও। পৌল নিজেই বলেছেন: “For if the truth of God hath more abounded through my lie unto his glory; why yet am I also judged as a sinner? কিন্তু আমার মিথ্যায় যদি ঈশ্বরের সত্য তাঁহার গৌরবার্থে উপচিয়া পড়ে, তবে আমিও বা এখন পাপী বলিয়া আর বিচারিত হইতেছি কেন?” (বাইবেল, নতুন নিয়ম)

বর্তমানে প্রচলিত বাইবেল থেকে যে কোনো পাঠক দেখবেন যে, যীশু খৃস্ট যেখানে এক ঈশ্বরে বিশ্বাস করতে, সালাত আদায় করতে, সিয়াম পালন করতে, সম্পদ সঞ্চয় না করতে, নারীর দিকে দৃষ্টিপাত না করতে, শুকরের মাংস ভক্ষণ না করতে, খাতনা করতে, তাওরাতের সকল নিয়ম পালন করতে এবং ব্যভিচার বর্জন করতে, সততা ও পবিত্রতা অর্জন করতে নির্দেশ দিয়েছেন, সেখানে পৌল এ সকল বিধান সব ‘বাতিল’ করে বলেছেন যে, শুধু যীশুকে ত্রাণকর্তা বিশ্বাস করলেই চলবে। বরং তিনি এ সকল বিধান নিয়ে নোংরা ভাবে উপহাস করে বলেছেন, বিধান পালন করে যদি জান্নাতে যেতে হয় তবে যীশু কি জন্য! যীশু-ভক্তির নামে তিনি নিজেই যীশুর সকল শিক্ষা বাতিল করে দিয়েছেন। পৌল প্রতিষ্ঠিত এ খৃস্টান ধর্মের মূল চরিত্রই হলো যুক্তি ও দলিল দিয়ে বা পাদরি-পোপদের নামে ধর্মের মধ্যে নতুন নতুন অনুষ্ঠান ও নিয়মকানুন জারি করা এবং যে সমাজে ও যুগে যা প্রচলিত আছে তাকে একটি “খৃস্টীয়” নাম দিয়ে বৈধ করে নেওয়া।

এ পরিবর্তনের ধারায় ৫ম-৬ষ্ঠ খৃস্টীয় শতকে লুপারকালিয়া উৎসবকে ‘সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে’ বা ‘সাধু ভ্যালেন্টাইনের দিবস’ নামে চালানোর ব্যবস্থা করা হয়। সেন্ট ভ্যালেন্টাইন নাম ব্যক্তিটি কে ছিলেন তা নিয়ে অনেক কথা আছে। তবে মূল কথা হলোম লুুপারকিালিয়া উৎসবকে খৃস্টান রূপ প্রদান করা। এভাবে আমরা দেখছি যে, এ দিবসটি একান্তই পৌত্তলিক ও খৃস্টানদের ধর্মীয় দিবস। কিন্তু বর্তমান যুগে “বিশ্ব ভালোবাসা দিবস” নাম দিয়ে এটিকে ‘ধর্ম নিরপেক্ষ’ বা সার্বজনীন রূপ দেওয়ার একটি সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত কার্যকর। যে দিবসটির কথা কয়েক বৎসর আগে দেশের কেউই জানত না, সে দিবসটির কথা জানে না এমন দেশে নেই বললেই চলে। ব্যাপক প্রচারের মাধ্যমেই এরূপ করা সম্ভব হয়েছে। এ চক্রান্তেরে উদ্দেশ্য “ভালবাসা দিবসের” নামে যুবক-যবতীদেরকে মাতিয়ে ব্যাপক ‘বাণিজ্য’ করা, যুবক-যুবতীদের নৈতিক ও চারিত্রিক ভিত্তি নষ্ট করে দেওয়া এবং তাদেরকে ভোগমুখী করে স্থায়ীভাবে আন্তর্জাতিক ‘বাণিজ্যিক’ সাম্রাজ্যবাদের অনুগত করে রাখা।

ইংরেজি Love, বাংলা ভালবাসা ও আরবী محبة একটি হর্দিক কর্ম। পানাহার, দর্শন, শ্রবণ ইত্যাদি কর্মের মত ভালবাসাও ইসলামের দৃষ্টিতে কখনো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং কখনো কঠিন নিষিদ্ধ হারাম কর্ম। পিতামাতাকে ভলবাসা, স্বামী-স্ত্রীসন্তানদেরকে ভালবাসা, ভাইবোনকে ভালবাসা, আত্মীয়-স্বজন, সঙ্গীসাথী ও বন্ধুদের ভালবাসা, সৎমানুষদেরকে ভালবাসা, সকল মুসলিমকে ভালবাসা, সকল মানুষকে ভালবাসা এবং সর্বোপরি মহান আল্লাহর সকল সৃষ্টিকে ভালবাসা ইসলাম নির্দেশিত কর্ম। এরূপ ভালবাসা মানুষের মানবীয় মূল্যবোধ উজ্জীবিত করে, হৃদয়কে প্রশস্ত ও প্রশান্ত করে এবং সমাজ ও সভ্যতার বিনির্মাণে কল্যাণময়, গঠনমূলক ভূমিক ও ত্যাগস্বীকারে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সাম্রাজ্যবাদের প্রচারিত তথাকথিত “বিশ্ব ভালবাসা দিবসে” ভালবাসার এ দিকগুলি একেবারেই উপেক্ষিত, অথচ সংঘাতময় এ পৃথিবীকে মানুষের বসবাসযোগ্য করার জন্য এরূপ ভালোবাসার প্রচার, প্রসার ও প্রতিষ্ঠার কতই না প্রয়োজন!

ভালবাসার একটি বিশেষ দিক নারী ও পুরুষের জৈবিক ভালবাসা। আন্তুর্জাতিক বেনিয়া সাম্রাজ্যবাদীরা ‘বিশ্ব ভালবাসা দিবসের’ নামে শুধু যুবক-যুবতীদের এরূপ জৈবিক ও বিবাহোত্তর বেহায়াপনা উস্কে দিচ্ছে। যুবক-যুবতীদের বয়সের উম্মাদনাকে পুঁজি করে তারা তাদেরকে অশ্লীলতার পঙ্কিলতার মধ্যে ডুবিয়ে দিয়ে তাদের সাম্রাজীবাদী ও বাণিজ্যিক স্বার্থসিদ্ধি করতে চায়।

ধর্মের নামে অনেক ধর্মে, বিশেষত পাদ্রী-পুরোহিত নিয়ন্ত্রিত খৃস্টান ধর্মে নারী-পুরুষের এরূপ ভালবাসা, দৈহিক সম্পর্ক ও পারিবারিক জীবনকে অবহেলা করা হয়েছে বা ঘৃণার চোখে দেখা হয়েছে। এখনো যেখানেই তারা সুযোগ পায় সংসার ও পরিবার বর্জন করে ‘নান’, ‘মঙ্ক’ বা সন্নাসী হওয়ার উৎসাহ দেয় এবং এরূপ হওয়াকে ধার্মিকতার জন্য উত্তম বলে প্রচার করে। পক্ষান্তরে ইসলামের পবিত্র গ্রন্থ আল কুরআন এ ধরণের সন্নাসী হতে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে এবং বিবাহ করাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত হিসেবে হাদীসেও বলা হয়েছে। আর যেনা-ব্যভিচারের পথ খুলে দিতে পারে এমন সকল কর্ম কঠিনভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। 

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

وَلَا تَقۡرَبُواْ ٱلزِّنَىٰٓۖ إِنَّهُۥ كَانَ فَٰحِشَةٗ وَسَآءَ سَبِيلٗا

“তোমরা ব্যভিচারের নিকটবর্তীও হয়ো না, নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতার নিকটবর্তী হয়ো না। (সূরা বানী ইসরাঙ্গীল : ৩২)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম বলেন:

“যখন কোন জাতির মধ্যে অশ্লীলতা এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে তারা প্রকাশ্যে অশ্লীলতায় লিপ্ত হতে থাকে, তখন তাদের মধ্যে এমন সব রোগব্যাধি ছড়িয়ে পড়ে যা তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে প্রসারিত ছিল না।” (আল হাদীস)

এ হাদীস পড়ে ও শুনে পাশ্চাত্যের অনেক অমুসলিম ইসলাম গ্রহণ করেছেন। কারণ দেড় হাজার বছর পূর্বে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সালাম যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন তা আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি। অশ্লীলতার প্রসারের কারণে এইডস নামক ভয়াবহ রোগ দেখা দিয়েছে, যা ইতিপূর্বে প্রসারিত ছিল না।

প্রিয় পাঠক! আসুন, অশ্লীলতার সকল পথ রোধে সচেষ্ট হই। মহান আল্লাহ্ আমাদেরকে তাওফীক প্রদান করুন। আ-মী-ন!!


 Visit Our English Site Click Here 



Thanks for reading. جزاك الله خيرا

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url