সাফল্য লাভ হয় কেবল উত্তম আমলের মাধ্যমে
কাতাদাহ (রহ) বলেন, ‘আমাদের নিকট বর্ণনা করা হয় যে, আহলে কিতাব (ইহুদী ও খৃস্টানগণ) ও মুসলিমদের মধ্যে তর্ক হয়। আহলে কিতাবীরা এই বলে মুসলিমদের উপর নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রকাশ করছিল যে, তাদের নাবী মুসা ও ঈসা (আঃ) মুসলিমদের নাবী মুহাম্মাদ (স)-এর পূর্বে দুনিয়ার বুকে আগমন করেছিলেন এবং তাদের কিতাবও মুসলিমদের কিতাবের পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছিল। মুসলিম ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের সাথের এই বিতর্কে আল্লাহ তা‘আলা মুসলিমদেরকে সমর্থন করে আল কুরআন-এ নিম্নোক্ত আয়াতে কারীমা নাযিল করেন। (তাবারী ৯/২২৯)
لَّيۡسَ بِأَمَانِيِّكُمۡ وَلَآ أَمَانِيِّ أَهۡلِ ٱلۡكِتَٰبِۗ مَن يَعۡمَلۡ سُوٓءٗا يُجۡزَ بِهِۦ وَلَا يَجِدۡ لَهُۥ مِن دُونِ ٱللَّهِ وَلِيّٗا وَلَا نَصِيرٗا- وَمَن يَعۡمَلۡ مِنَ ٱلصَّٰلِحَٰتِ مِن ذَكَرٍ أَوۡ أُنثَىٰ وَهُوَ مُؤۡمِنٞ فَأُوْلَٰٓئِكَ يَدۡخُلُونَ ٱلۡجَنَّةَ وَلَا يُظۡلَمُونَ نَقِيرٗا-
না তোমাদের বৃথা আশায় কাজ হবে, আর না আহলে কিতাবের বৃশা আশায়; যে অসৎ কাজ করবে সে তার প্রতিফল পাবে এবং সে আল্লাহর পরিবর্তে কেহকে বন্ধু অথবা সাহায্যকারী প্রাপ্ত হবে না।
পুরুষ অথবা নারীর মধ্যে যারা সৎ কাজ করে এবং সে বিশ্বাসীও হয়, তাহলে তারাই জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং তারা খেজুর দানার কণা পরিমাণও অত্যাচারিত হবে না। (সূরা নিসা : ১২৩-১২৪)
আল আউফী (রহ) বলেন যে, এ আয়াতের ব্যাপারে ইব্ন আব্বাস (রা) বলেছেনঃ বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে তাদের ধর্ম বিষয়ে বিতর্ক হয়। তাওরাতের অনুসারীরা বলেঃ আমাদের ধর্মগ্রন্থই উত্তম গ্রন্থ এবং আমাদের নাবী হলেন শ্রেষ্ঠ নাবী। ইঞ্জিল গ্রন্থের অনুসারীরাও অনুরূপ কথা বলে। তখন মুসলিমরা বলেন, ইসলাম ছাড়া আর কোন ধর্ম নেই, আমাদের ধর্মগ্রন্থ নাযিল হওয়ার পর অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ বাতিল হয়ে গেছে, আমাদের নাবী হলেন সর্বশেষ নাবী এবং তোমাদের আদেশ করা হয়েছে যে, তোমরা তোমাদের গ্রন্থের উপর বিশ্বাস রাখবে এবং আমাদের ধর্মগ্রন্থের উপর আমল করবে। আল্লাহ তা‘আলা তখন তাদের তর্কের ফাইসালা এভাবে করে দেনঃ
“না তোমাদের বৃথা আশায় কাজ হবে, আর না আহলে কিতাবের বৃশা আশায়; যে অসৎ কাজ করবে সে তার প্রতিফল পাবে” (তাবারী ৯/২৩০)
আয়াতের বিষয়বস্ত এই যে, শুধু মুখের কথা ও দাবীর দ্বারা সত্য প্রকাশিত হয়না। বরং ঈমানদার হচ্ছে ঐ ব্যক্তি যার অন্তর পরিষ্কার হয়, আমল তার সাক্ষী স্বরূপ হয় এবং আল্লাহ প্রদত্ত দলীল তার হাতে থাকে। হে মুশরিকদের দল! তোমাদের মনের বাসনা ও অসার দাবীর কোন মূল্য নেই এবং তাহলে কিতাবের উচ্চাকাংখা এবং বড় বড় বুলিও মুক্তির মাপকাঠি নয়। বরং মুক্তির মাপকাঠি হচ্ছে মহান আল্লাহর নির্দেশাবলী পালন ও রাসূলগণের আনুগত্য স্বীকার। মন্দ আমলকারীদের সঙ্গে কি এমন সম্বন্ধ রয়েছে যে, যার কারণে তাদেরকে তাদের মন্দ কাজের প্রতিদান দেয়া হবেনা? বরং কিয়ামাতের দিন ভাল-মন্দ যে যা করেছে তিল পরিমাণ হলেও তার চোখের সামনে তা প্রকাশিত হয়ে পড়বে। আল্লাহ তা‘আলা বলেনঃ
فَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٍ خَيۡرٗا يَرَهُۥ- وَمَن يَعۡمَلۡ مِثۡقَالَ ذَرَّةٖ شَرّٗا يَرَهُۥ-
“কেউ অণু পরিমাণ সৎ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে এবং কেউ অণু পরিমাণ অসৎ কাজ করলে তাও দেখতে পাবে।” (সূরা যিলযাল : ৭-৮)
এ আয়াতটি সাহাবীগণের সামনে খুবই কঠিন ঠেকেছিল। আবূ বাকর (রা) বলেছিলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! অণু পরিমাণ কাজেরও যখন প্রতিদান দেয়া হবে তখন মুক্তি কিরূপে পাওয়া যাবে?’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ ‘প্রত্যেক মন্দ কার্যকারী দুনিয়ায়ই প্রতিদান পাবে।’ একটি হাদীসে রয়েছে যে, আয়িশা (রা) বলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম! এ আয়াতটি আমাদের উপর খুব ভারী বোধ হচ্ছে।’ তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেনঃ আপতিত হয়।’ (তাবারী ৯/২৪৬, আবূ দাঊদ ৩/৪৭১)
সাঈদ ইবনে মানসূর (রহ) বলেন যে, যখন উপরোক্ত আয়াতটি সাহাবীগণের উপর ভারী বোধ হয় তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাদেরকে বলেনঃ ‘তোমরা সঠিকভাবে এবং মিলেমিশে থাক, মুসলিমের প্রত্যেক বিপদই হচ্ছে তার পাপের প্রায়শ্চিত্ত, এমনকি কাঁটা ফুটলেও (ঐ কারণে পাপ ক্ষমা হয়ে থাকে।)’ এই বর্ণনাটি ইমাম আহমাদ (রহ) সুফিয়ান ইব্ন উয়াইনা (রহ) থেকে বর্ণনা করেছেন। ইমাম মুসলিম (রহ) এবং ইমাম তিরমিযীও (রহ) তাদের গ্রন্থে লিপিবদ্ধ করেছেন। (সহীহ মুসলিম ৪/১৯৯৩), আহমাদ ২/২৪৮)
মন্দ কাজের শাস্তির বর্ণনা দেয়ার পর আল্লাহ্ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলা সৎ কাজের প্রতিদানের বর্ণনা দিয়েছেন। মন্দ কাজের শাস্তি হয়তো দুনিয়ায়ই দেয়া হয় এবং এটাই বান্দার জন্য উত্তম, অথবা পরকালে দেয়া হয়। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে এটা হতে রক্ষা করুন। আমরা তাঁর নিকট প্রার্থনা জানাচ্ছি যে, তিনি যেন আমাদেরকে উভয় জগতে নিরাপত্তা দান করেন এবং আমাদেরকে যেন তিনি দয়া ও ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখেন। আমাদেরকে যেন তিনি ধরপাকড় ও অসন্তুষ্টি হতে রক্ষা করেন। সৎ কার্যাবলী আল্লাহ তা‘আলা পছন্দ করেন এবং স্বীয় অনুগ্রহ ও করুণা দ্বারা তা গ্রহণ করে থাকেন। কোন নর-নারীর সৎ কাজ তিনি নষ্ট করেননা। তবে শর্ত এই যে, তাকে হতে হবে মুসলিম। এ সৎ লোকদেরকে তিনি স্বীয় জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তাদের সাওয়াব তিনি মোটেই কম হতে দিবেননা। এমনকি খেজুরের আঁটির উপরিভাগের পাতলা আঁশের সমতুল্যও তিনি কোন বান্দার প্রতি জুলম করবেন না। (তাফসীর ইবনে কাসীর)
মহান আল্লাহ আমাদেরকে বেশি বেশি নেক আমল করার তৌফিক দান করুন এবং সাফল্যলাভে ধন্য করুন। আ-মী-ন!!
Thanks for reading. جزاك الله خيرا