শা’বান মাসে করণীয়

শা’বান মাসে করণীয়



শা’বান মাস একটি মুবারক মাস। বিভিন্ন সহীহ্ হাদীস থেকে আমরা জানতে পারি যে, রাসূল (স) এ মাসে বেশি বেশি নফল সিয়াম পালন করতেন। শাবান মাসের সিয়ামই ছিল তাঁর কাছে সবচেয়ে প্রিয়। এমাসের প্রথম থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত এবং কখনো কখনো প্রায় পুরো মাসই তিনি নফল সিয়াম পালন করতেন। এ বিষয়ে তাঁকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এ মাসে আল্লাহর নিকট বান্দার কর্ম  উঠানো হয়। আর আমি ভালবাসি যে, আমার সিয়াম রাখা অবস্থায় আমার আমল উঠানো হোক।” (নাসাঈ ৪/২০১, সনদ হাসান)

এ মাসের বিশেষ একটি রাতের কথা আমরা সবাই জানি, তা হলো- শবে বরাত বা ভাগ্য রজনী। বলা হয়, এ রাতে ভাগ্য অনুলিপি করা হয় বা পরবর্তী বছরের জন্য হায়াত-মওত ও রিযক ইত্যাদির অনুলিপি করা হয়। তবে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, এ অর্থে বর্ণিত হাদীসগুলির সনদ অত্যন্ত দুর্বল অথবা জাল ও বানোয়াট। এ অর্থে কোন সহীহ, হাসান বা কোনো গ্রহণযোগ্য হাদীস বর্ণিত হয় নি। (ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, খুতবাতুল ইসলাম, পৃ-২৬৩)

অনেকে সূরা দুখানের ৩ ও ৪ নং আয়াত শবে বরাত প্রমাণের জন্য উল্লেখ করে থাকেন। কিন্তু এ ব্যাপারে প্রায় সব মুফাসসির একমত যে, উক্ত আয়াত্বয় দ্বারা লাইলাতুল বরাত বা শবে ক্বদর বোঝানো হয়েছে, যা রমজানুল মুবারকে রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, হাদীসে এবং সাহাবী-তাবেয়ীদের যুগে “শবে বরাত” বা “লাইলুত বরাত” পরিভাষাটি ছিল না। হাদীসের ভাষ হলো “লাইলাতু নিসফি শা’বান” বা “মধ্য শা’বানের রাত”। এ মর্মে যে হাদীসটি পাওয়া যায় তা হলো- “আল্লাহ তা’য়ালা মধ্য শা’বানের রাতে তাঁর সৃষ্টির প্রতি দৃকপাত করেন এবং মুশরিক ও বিদ্বষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন। (ইবনু মাজাহ ১/৪৪৫)

উক্ত হাদীসটির মাধ্যমে নিসফে শাবান রাতের  বিশেষ ফযিলতের কথা জানা গেলেও উহা দ্বারা কোন বিশেষ আ’মল বা রাত জাগরণ তথা মিলাদ-মাহফিল ইত্যাদি করার কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং বলা হয়েছে- ২টি অপরাধ না থাকলে অটোভাবে সকলকে মাফ করা হবে। এর চেয়ে বড় সুখবর আর কি হতে পারে? অপরাধ ২টি ছেড়ে দিলেই হলো। উক্ত অপরাধদ্বয় (১) শিরক ও (২) হিংসা-বিদ্বেষ কত জঘন্য অপরাধ তা এখান থেকেই পরিষ্কার অনুমেয় হয়।

উক্ত মর্মে সহীহ্ মুসলিমে (৪/১৯৮৮) বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে- “মানুষের আমল প্রতি সপ্তাহে দুবার পেশ করা হয়: প্রতি সোমবার ও বৃহস্পতিবার। তখন সকল মুমিন বান্দাকে ক্ষমা করা হয়, কেবলমাত্র যে বান্দার সাথে তার (কোন মুসলিম) ভাইয়ের বিদ্বেষ-শত্রুতা আছে সে ব্যক্তি বাদে। বলে দেয়া হয়, এরা যতক্ষণ না ফিরে আসে ততক্ষণ এদেরকে বাদ দাও (এরা ক্ষমা পাবে না)।”

মুসলিম ভাইকে ভালবাসা ও তার কল্যাণকামনা করা যেমন ফরয ইবাদত, তেমনি ভয়ঙ্কর হারাম তথা পাপের কাজ হলো মুসলিম ভাইকে শত্রু মনে করা, তার প্রতি হৃদয়ের মধ্যে অশুভকামনা ও শত্রুতা পোষণ করা। কোনো কারণে কাউকে ভালবাসতে না পারলে অন্তত শত্রুতা ও অশুভকামনার অনুভূতি থেকে হৃদয়কে রক্ষা করা আমাদের অন্যতম দায়িত্ব।

সম্মানিত পাঠক, শয়তান সকল আদম সন্তানকেই জাহান্নামে নিতে চয়। কুফরী করা, নেশা করা, যেনা-ব্যভীচার করা ইত্যাদি মহাপাপ তার অস্ত্র। তবে যে সকল মানুষ অন্তত উল্লেখিত কবীরাগুলো থেকে নিজেকে রক্ষ করে চলে শয়তান তখন ভিন্নধর্মী তিনটি অস্ত্র ব্যবহার করে। তা হলো- (১) শিরক্ (২) বিদ‘আত এব (৩) হিংসা-বিদ্বেষ। 

এমর্মে এক হাদীসে রাসূল (স) বলেন, “পূর্ববর্তী ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতিগুলির ব্যাধি তোমাদের মধ্যেও সঞ্চারিত হয়েছে। : হিংসা ও বিদ্বেষ। এই বিদ্বেষ মুন্ডন করে দেয়। আমি বলি না যে তা চুল মন্ডন করে, বরং তা দ্বীন মুন্ডন ও ধ্বস করে দেয়। আমার প্রাণ যাঁর হাতে তাঁর শপথ করে বলছি, মুমিন না হলে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আর একে অপরকে ভালো না বাসলে তোমরা মুমিন হতে পারবে না। এ ভালোবাসা প্রতিষ্ঠার মাধ্যম আমি শিখিয়ে দিচ্ছি, সর্বত্র ও সর্বদা পরস্পরে সালাম প্রদানের রেওয়াজ চালু রাখবে।” (সুনানে তিরমিযি ৪/৬৬৪)

উল্লেখ্য যে, আমরা ধর্মীয় আমলগত কারণেও আমরা এক মুসলিম অপর মুসলিমের সাথে বিদ্বেষ ও শত্রুতা করে থাকি। যা মোটেও কাম্য নয়। ধরা যাক, যারা ঘটা করে শবে বরাত পালন করে থাকেন তারা মোটেও সহ্য করতে চাইবেন না যারা তা করেন না তাদেরকে। আবার এর উল্টটাও অনেক সময় দেখা যায়। এ ছাড়াও মাযাহাব-লা মাযহাব, সুন্নী-ওয়াহাবী ইত্যাদি ইসুতেও আমরা পরস্পর হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতায় লিপ্ত হই। অথচ একটু চিন্তা করুণ, সামান্য আমলের তারতম্যের কারণে আমরা যদি এমনটা করি তাহলে তাহলে তো ফরজ সালাত, সাওম, দাড়ি রাখা ইত্যাদি যারা করে না তাদের সাথে তো তা আরো বেশি থাকা দরকার ছিল। কিন্তু তা কি আছে? বরং তার খবরেই না। খবর আছে শুধু- কারা মিলাদ করছে না, কে শবে বরাত রাতে জাগরণ করছে না, কেন করছে না? এই ব্যাটারা নবী (স)-এর দুশমন ইত্যাদি। এই সব বলেই যেন এক শ্রেণির ভাইয়ের নিজেকে বেশ মস্ত বড় আশেকে রাসূল বানিয়ে বসে আছেন। অথচ অন্যান্য ফরজ ইবাদতসমূহই যারা করছে না তাদের নিয়ে তাদের মাথা ব্যথা নেই, হিংসা-বিদ্বেষও নেই। যত মাথা ব্যথা সব শিরক-বিদ’আত টাইপের আমল নিয়ে(?)! মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সহীহ্ বুঝ দান করেন! (আ-মী-ন)

শবে বরাত রাতের প্রচলিত আ‘মল কতটুকু সহীহ্?
এ মর্মে বহুল আলোচিত একটি হাদীস হলো: “যখন মধ্য শা‘বানের রাত আসে তখন তোমরা রাতে (সালাত ও দোয়ায়) দন্ডায়মান থাক এবং দিবসে সিয়াম পালন কর। কারণ, ঐ দিন সূর্যাস্তের পর আল্লাহ পৃথিবীর আকাশে অবতরণ করেন  এবং বলেন, কোন ক্ষমা প্রার্থনা কারী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। কোন রিযিক অনুসন্ধানকারী আছে কি? আমি তাকে রিয্ক প্রদান করব। কোন দুর্দশাগ্রস্ত ব্যক্তি আছে কি? আমি তাকে মুক্ত করব। এভাবে সুবহে সাদিক উদয় হওয়া পর্যন্ত চলতে থাকে।” (ইবনু মাজাহ ১/৪৪৪; এ হাদীসের একমাত্র বর্ণনাকারী ইবনু আবী সাবরাকে ইমাম বুখারী ও অন্যান্য মুহাদ্দীসগণ মিথ্যাবাদী বলে অভিযুক্ত করেছেন। এ ছাড়া এ অর্থে আরো কয়েকটি হাদীস রয়েছে তবে সেগুলোও যঈফ তথা দুর্বল।-বিস্তারিত দেখনু : খুতবাতুল ইসলাম, পৃ-২৬৭)

উল্লিখিত হাদীসটি যে একটি বানোয়াট হাদীস তার প্রমাণ হলো- আল্লাহ বান্দাহকে আহবান করার যে কথা বলা হয়েছে তা অনেক সহীহ্ এর বর্ণনায়ও রয়েছে কিন্তু তা ঐ রাতের জন্য খাস নয়; বরং ঐসব হাদীসে প্রতি রাতের শেষ ভাগে ঐ ভাবে আল্লাহ আহবান  করেন মর্মে বলা হয়েছে। কিন্তু এতো সুন্দর ব্যবস্থাকে বদলিয়ে বছরে এক রাত ইবদত করেই পার-এটা শয়তানী ষঢ়যন্ত্র ছাড়া আর কি হতে পারে? 
উল্লেখ্য, উক্ত বানোয়াট (জাল) হাদীসটিতে শুধু সাওম (রোযা) এর কথা বলা হয়েছে। পক্ষান্তরে অনেক সহীহ্ হাদীস বলছে, রাসূল (স) এ মাসে অনেক সাওম পালন করতেন। এখন সিদ্ধান্ত আপনার, সহীহ্ হাদীস সমূহের উপর আমল করবেন নাকি  উল্লেখিত জাল হাদীসের উপল আমল করবেন।

পরিশেষে সহীহ্ বুখারী ও সহীহ্ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদীস উল্লেখ করছি, আশ করি সকলে এই সহীহ্ আমলটি করে নিজের জীবন ধন্য করার চেষ্টা করবেন। হাদীসটি হলো:
“প্রতি রাতের দুই তৃতিয়াংশ অতিবাহিত হলে আল্লাহ প্রথম আসমানে নেমে বলেন, আমিই রাজাধিরাজ, আমিই রাজাধিরাজ। আমাকে ডাকার কেউ আছে কি? আমি তার ডাকে সাড়া দিব। আমার কাছে চাওয়ার কেউ আছে কি? আমি তাকে প্রদান করব। আমার কাছে ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। প্রভাতের উন্মেষ হওয়া পর্যন্ত এভাবে তিনি বলতে থাকেন।” (সহীহ্ মুসলিম ১/৫২২)

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সহীহ্ বুঝ দান করুন এবং আল্ কুরআন ও সহীহ্ হাদীস মোতাবেক আমল করার তৌফিক দানে ধন্য করুন! আ-মী-ন!

Visit Our English Site Click Here 



Thanks for reading. جزاك الله خيرا

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url