সৃষ্টির সেবা ও সুন্দর আচরণ
আল্লাহর রহমত, বরকত ও সাওয়াব অর্জনের সবচেয়ে সহজ ও সংক্ষিপ্ত পথ হলো আল্লাহর সৃষ্টির প্রতি, বিশেষত মানুষের প্রতি সহযোগিতা, কল্যাণ ও উপকারের হাত বাড়িয়ে দেওয়া। এ বিষয়টি সম্পর্কে অনেকেই অসচেতন। আমরা যিকর, তাহাজ্জুদ ইত্যাদি ইবাদতের সাওয়াব সম্পর্কে যতটকু সচেতন, সৃষ্টির সেবার ফযীলত, গুরুত্ব ও সাওয়াব সম্পর্কে আমরা মোটেও সচেতন নই। অথচ কুরআন ও হাদীসে এ বিষয়ে অগণিত নির্দেশনা রয়েছে।
সৃষ্টির সেবা বনাম আল্লাহর ভালবাসা
আল্লাহকে ভালবাসতে হলে অবশ্যই তাঁর সৃষ্টিকে ভালবাসতে হবে এবং তাদের সেবা ও সাহায্য এগিয়ে আসবে হবে। জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সকল মানুষকে সকল জাগতিক প্রয়োজনে সাহায্য করা, সমাজের কিছু মানুষের মধ্যে পরস্পরে গোলমাল বা অশান্তি হলে শান্তি প্রতিষ্ঠার চেষ্ঠা করা, অসুস্থকে দেখতে যাওয়া, সেবা করা, বিপদে পড়লে উদ্ধার করা, মাযলূম হলে সাহায্য করা, মৃত্যুবরণ করলে কাফন-দাফনে শরীক হওয়া ইত্যাদি সকল প্রকার মানুব সেবামূলক কাজের জন্য অকল্পনীয় সাওয়াব ও মর্যাদার কথা অগণিত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।
রাসূল (স) বলেন,
على كل مسلم صدقة فقالوا يا نبى الله فمن لم يجد قال يعمل بيده فينفع نفسه ويتصدق قالوا فإن لم يجد قال يعين ذا الحاجة الملهوف قالوا فإن لم يجد قال قليعمل بالمعروف وليمسك عن الشر فإنها له صدقة. وفي حديث: تعين صانعا أو تصنع لاخرق قال قلت يا رسول لله أريت إن ضعفت عن بعض العمل قال تكف شرك عن الناس فإنها صدقة منك على نفسك.
“প্রত্যেক মুসলিমের দায়িত্ব মানুষের কল্যাণে ব্যয় করা। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর নবী, যদি কারো দান করার মত কিছুই না থাকে? তিনি বলেন, সে নিজ হাতে কর্ম করবে, যে কর্মের উপার্জন দিয়ে সে নিজে উপকৃত হবে এবং অন্যকে দান করবে। সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, যদি সে তাও করতে সক্ষম না হয়? তিনি বলেন, সে সমস্যাগ্রস্ত সাহায্য-প্রার্থীকে সাহায্য করবে। তাঁরা বলেন, যদি সে তাও করতে অক্ষম হয়? তিনি বলেন, তাহলে সে কল্যাণমুখী কর্ম করবে এবং অকল্যাণকর কর্ম থেকে নিজেকে বিরত রাখবে। এই কর্মও তার জন্য দান বলে গণ্য হবে।” অন্য বর্ণনায়: “তুমি পেশাদার শ্রমিক বা কর্মজীবিকে সাহায্য করবে, অদক্ষ বা কর্মহীন বেকারের জন্য কর্ম করবে।” সাহাবী প্রশ্ন করেন: “হে আল্লাহর রাসূল যদি আমি দুর্বলতার কারণে কিছু কিছু নেক কর্ম করতে অক্ষম হই তবে কি করব?” তিনি বলেন, “তুমি কোনো মানুষের ক্ষতি বা অকল্যাণ কামনা করবে না। মানুষের অকল্যাণ করা থেকে বিরত থাকাও তোমার নিজের জন্য নিজের পক্ষ থেকে দান বলে গণ্য হবে।” (সহীহ্ বুখারী ২/৫২৪, মুসলিম ২/৬৯৯)
কারো বিবাদ মিটিয়ে দেওয়াও সাদ্কা
রাসূল (স) বলেন,
يعدل بين الإثنين صدقة ويعين الرجل على دابته فيحمل عليها أو يرفع عليها متاعه صدقة والكلمةُ الطيبةُ صدقةٌ وكلُّ خُطْوةٍ يخطوها إلى الصلاة صدقةٌ ويُميط الأذى عن الطريق صدقةٌ.
“দু’জন মানুষের মধ্যে বিবাদ মিটিয়ে ন্যায়-সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠা করা দান বলে গণ্য, কোন মানুষকে তার বাহন নিয়ন্ত্রণ বা পরিচালনা করতে সাহায্য করা দান বলে গণ্য, কারো বাহনে তার জিনিসপত্র তুলে দেওয়া দান বলে গণ্য, সুন্দর আনন্দদায়ক কথা দান বলে গণ্য, মসজিদে গমনের জন্য প্রতিটি পদক্ষেপ দান বলে গণ্য এবং রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক দ্রব্য সরিয়ে দেওয়া দান বলে গণ্য।” (সহীহ বুখারী ২/৯৬৪, ৩/১০৯০)
অন্যের কল্যাণ কামনার মধ্যেই নিজের কল্যাণ নিহিত
রাসূল (স) ইরশাদ করেন:
واللهُ في عونِ العبدِ ما كان العبدُ في عونِ أخيه.
“যতক্ষণ একজন মানুষ অন্য কোনো মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত থাকবে ততক্ষণ আল্লাহ তার কল্যাণে রত থাকবেন।” (সহীহ্ মুসলিম ৪/২০৭৪)
এ মর্মে রাসূল (স) আরো বলেন:
صنائعُ المعروفِ تقي مصارعَ السُّوء وصدقةُ السِّرِّ تُطفِىءُ غضَبَ الرَّبِّ وصِلَةُ الرَّحِمِ تَزِيدُ في العُمُر.
“মানব-কল্যাণমুখী কর্ম বিপদাপদ ও অপমৃত্যু থেকে থেকে রক্ষা করে, গোপন দান আল্লাহর ক্রোধ নির্বাপিত করে, রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করা আয়ু বৃদ্ধি করে। (আলবানী, সহীহু তারগীব ১/২১৬)
রাসূল (স)-এর সঙ্গে জান্নাতে থাকার আমল
এ মর্মে রাসূল (স) বলেন:
أنا وكافلُ اليتيمِ في الجنة هكذا وقال بإصبَعَيهِ السَّبَّابةِ والوُسطَى.
“যে ব্যক্তি এতিম-অনাথের রক্ষণাবেক্ষণ বা লালনপালন করে সে আমার সাথে পাশাপাশি জান্নাতে থাকবে, একথা বলে তিনি মধ্যমা ও তর্জনীকে পাশাপাশি রেখে দেখান।” (সহীহুল বুখারী ৫/২০৩২)
বিধবা ও দরিদ্রদের প্রতি দায়িত্ব পালনের বিশেষ ফযিলত
এ মর্মে রাসূল (স) বলেন:
الساعي على الأرملةِ والمسكينِ كالمجاهد في سبيل الله وكالقائم لايفتُرُ وكالصائم لايُفطِرُ.
“বিধবা ও দরিদ্রদের স্বার্থসংরক্ষণ বা কল্যাণের জন্য চেষ্টারত মানুষ আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে রত, ক্লান্তিহীন বিরামহীন ও তাহাজ্জুদ আদায়কারী এবং অবিরত সিয়ামপালনকারী ব্যক্তির ন্যায়।” (সহীহুল বুখারী ৫/২০৪৭, ২২৩৭, মুসলিম ৪/২২৮৬)
সৃষ্টির সেবাতেই আল্লাহর সেবা
এ মর্মে রাসূল (স) বলেন:
إنَّ اللهَ يقول يومَ القيامة يا ابنَ آدم مرضتُ فلم تَعُدْنِي ...
“কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ ছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে দেখতে যাও নি! সে বলবে, হে রাব্ব, আপনি তো রাব্বুল আলামীন, আমি কিভাবে আপনাকে দেখতে যাব? তিনি বলবেন, তুমি তো জেনেছিলে যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, তবুও তুমি তাকে দেখতে যাও নি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে তবে আমাকে তার কাছে পেতে। হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে খাদ্য দাও নি। সে বলবে, হে রাব্ব, আপনি তো রাব্বুল আলামীন, আমি কিভাবে আপনাকে খাদ্য দিব? তিনি বলবেন, তুমি কি তো জেনেছিলে যে, তুমি যদি তাকে খাদ্য দিতে আমার নিকট তা পেতে। হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিলাম কিন্তু আমি আমাকে পানি দেও নি। সে বলবে, হে রাব্ব, আপনি তো রাব্বুল আলামীন, আমি কিভাবে আপনাকে পানি পান করতে দেব? তিনি বলবেন, তুমি তো জেনেছিল যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি পান করতে দেব? তিনি বলবেন, তুমি তো জেনেছিলে যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে পানি পান করতে চেয়েছিল কিন্তু তুমি তাকে পানি দাও নি। তুমি কি জানতে না যে, তুমি যদি তাকে দেখতে যেতে তবে আমাকে তার কাছে পেতে। ” (সহীহুল মুসলিম ৪/১৯৯০)
এ মর্মে রাসূল (স) আরো বলেন:
“আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই সবচেয়ে প্রিয় যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে। আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয় আমল হলো কোন মুসলিমের হৃদয়ে প্রবেশ করান, অথবা তার বিপদ, কষ্ট বা উৎকণ্ঠা দূর করা, অথবা তার ঋণ আদায় করে দেওয়া, অথবা তার ক্ষুধা দূর করা। আমার কোনো ভাইয়ের কাজে তার সাথে একটু হেঁটে যাওয়া আমার কাছে এই মাসজিদে অর্থাৎ মাসজিদে নববীতে এক মাস ইতেকাফ করার চেয়েও বেশি প্রিয়। যে ব্যক্তি তার ক্রোধ সম্বরণ করবে, আল্লাহ তার দোষত্রুটি গোপন রাখবেন। কেউ নিজের ক্রোধ কার্যকর করার সুযোগ থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি তা সম্বরণ করবে, কিয়ামতের দিন মহিমাময় আল্লাহ তার অন্তরকে নিরাপত্তা ও সন্তুষ্টি দিয়ে ভরে দিবেন। যে ব্যক্তি তার কোনো ভাইয়ের সাথে যেয়ে তার প্রয়োজন মিটিয়ে দেবে কিয়ামতের কঠিন দিন যেদিন পুল-সিরাতের উপরে সকলের পা পিছলে যাবে সেদিন আল্লাহ তার পা সুদৃঢ় রাখবেন। সিরকা বা ভিনিগার যেমন মধু নষ্ট করে দেয় তেমনিভাবে অসৌজন্যমূলক আচরণ মানুষের নেক কর্ম বিনষ্ট করে দেয়।” (আলবানী, সহীহুল জামি ১/৯৭)
এ মর্মে রাসূল (স) আরো বলেন:
“কিয়ামতের দিন যে সকল বান্দাকে আল্লাহ সর্বেোচ্চ সম্মান দিয়ে আরশের ছায়ায় আশ্রয় দিবেন তাদের অন্যতম হলেন ন্যায়পরয়ণ বা ইনসাফের সাথে দায়িত্বপালানকারী কর্মকর্তা, প্রশাসক বা শাসক।”
মানুষের উপকর করা বিদপ মুক্তির উপায়
সহীহ বুখারী ও অন্যান্য বিভিন্ন গ্রন্থে বর্ণিত একটি হাদীসে রাসূল (স) বলেন:
“তিন ব্যক্তি একবার বিজন মরুভূমির মধ্যে এক পাহাড়ের গুহার মধ্যে আশ্রয় নিয়েছিলেন। প্রবল বৃষ্টিতে বিশাল এক পাথর পড়ে গুহার মুখটি সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এভাবে গুহাটি তাদের জীবন্ত কবরে পরিণত হয়। তারা অনেক চেষ্টা করেও পাথরটি একচুল নড়াতে সক্ষম হয় না। সর্বশেষ তারা নিজেদের জীবনে প্রিয়তম নেক আমলের ওসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করেন।
তাঁদের একজন তাঁর বৃদ্ধ পিতামাতার খিদমতের ওসীলা দিয়ে, দ্বিতীয়জন শ্রমিকের পাওনা সঠিকভাবে বুঝিয়ে দেওয়ার ওসীলা দিয়ে এবং তৃতীয়জন সুযোগ থাকা সত্ত্বেও ব্যভিচার না করে মানুষের উপকার করার ওসীলা দিয়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করেন যে, হে আল্লাহ, কেবলমাত্র আপনার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্যেই আমরা এরূপ করেছিলাম। আপনি যদি আমাদের এ কর্ম কবুল করে থাকেন তবে তার ওসীলায় আমাদের এ কঠিন বিপদ কাটিয়ে দেন। তখন আল্লাহ অলৌকিকভাবে পাথরটি সরিয়ে দেন ”
بينما رجلٌ يمشي بطريقٍ وجد غصنَ شوكٍ على الطريقِ فأخَّره فشَكرَ اللهُ له فغَفَرَ له.
“এক ব্যক্তি রাস্তায় চলতে চলতে একটি কাটাওয়ালা ডাল দেখতে পায়, সে ডালটি সরিয়ে দেয়। আল্লাহ তার এ কাজ কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেন।” (সহীহ্ বুখারী ১/২৩৩, ২/৮৭৪, মুসলিম ৩/১৫২১, ৪/২০২১)
এক ব্যক্তি বিজন পথে চলতে চলতে পিপাসার্ত হলে একটি কূপে নেমে পানি পান করে। কূপ থেকে বেরিয়ে সে দেখে যে, একটি কুকুর পিপাসার্ত হয়ে হয়ে হাঁপাচ্ছে এবং মাটি চাটছে। লোকটি বলে, আমার যেমন কষ্ট হচ্ছিল এ কুকুরটিরও তেমন কষ্ট হচ্ছে। তখন সে কূপের মধ্যে নেমে নিজের চামড়ার মোজাটি পানিপূর্ণ করে মুখে কামড়ে ধরে দুহাত দিয়ে কূপ থেকে উঠে আসে এবং কুকুরটিকে পানি খাওয়ায়। আল্লাহ এতে খুশি হয়ে তার এ কর্ম কবুল করেন এবং তাকে ক্ষমা করে দেয়। সাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল, জীব-জানোয়ারের সেবাতেও কি আমারা সাওয়াব পাব? তিনি বলেন,
في كلِّ كَبِدٍ رَطبةٍ أجر যে কোনো প্রাণের সেবাতেই তোমরা সাওয়াব পাবে।” (সহীহ্ বুখারী, ২/৮৩৩, ৮৭০, মুসলিম ৪/১৭৬১)
এমর্মে রাসূল (স) বলেন:
من سَتَّرَ مسلما ستَّره الله في الدنيا والأخرة
“যে ব্যক্তি কোনো মুসলিমের দোষ গোপন রাখবে আল্লাহ দুনিয়া ও আখিরাতে তার দোষ গোপন রাখবেন।” (বুখারী ২/৮৬২, মুসলিম ৪/১৯৯৬)
“যে ব্যক্তি কোন মুমিন ব্যক্তির দোষ গোপন করল, সে যেন জীবন্ত প্রথিত একটি কন্যাকে তার কবর থেকে উঠিয়ে জীবন দান করল।” (সহীহ্ ইবনু হিব্বান, ২/২৭৫)
মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সহীহ্ বুঝ দান করুন এবং আল্ কুরআন ও সহীহ্ হাদীস মোতাবেক আমল করার তৌফিক দানে ধন্য করুন! আ-মী-ন!
