বিদ’আতের পরিচয়, পরিণাম ও প্রচলিত বিদ‘আতসমূহ

বিদ’আতের পরিচয়



বিদ‘আত কাকে বলে?

‘বিদ‘আত’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ- নতুন সৃষ্টি। পূর্বে যার অস্তিত্ব ছিল না তা-ই বিদ‘আত। (ইমাম শাত্বেবী, কিতাবুল ই’তিছাম, ১ম খন্ড, পৃ-১৯-২১)
বিদ‘আতের পারিভাষিক অর্থ হল- ‘আল্লাহর নৈকট্য হাছিলের উদ্দেশ্যে দ্বীনের নামে নতুন কোন প্রথা চালু করা, যা শরী‘আতের কোন ছহীহ্ দলীলের উপর  ভিত্তিশীল নয়।’ (সালীম হেলালী, আল-বিদ‘আহ, পৃ-৬)
 
অর্থাৎ, বিদ‘আত হল- দ্বীনের মধ্যে এমন বিষয় তৈরি, সৃষ্টি বা আবিষ্কার করা, যা রাসূল (ছা) ও খোলাফায়ে রাশেদার যুগে ছিল না; বরং পরবর্তীতে দ্বীনের নামে উদ্ভাবন করা হয়েছে বা ইবাদতের মধ্যে নতুন আবিষ্কৃত কাজ। 

উল্লেখ্য, যে কোন নব আবিষ্কারই কিন্তু আভিধানিক অর্থে বিদ‘আত। যেমন- গাড়ী, কম্পিউটার ইত্যাদি। এটা কিন্তু পারিভাষিক অর্থে বিদ‘আত নয়। কারণ, এসব আবিষ্কার বা উদ্ভাবন কেউ ইবাদত বা সাওয়াবের কাজ ভেবে করে না। যখনই যেকোন নব আবিষ্কৃত কাজকে কেউ দ্বীনী কাজ বা সাওয়াবের উদ্দেশ্যে করা হয় তখনই তা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। (প্রশ্নোত্তরে আরকানুল ইসলাম, পৃ-১২১)

বিদ‘আতীদের পরিণাম

এমর্মে হদীসে ইরশাদ হয়েছে-
(১) যে ব্যক্তি বিদ‘আতীকে সম্মান করে সে ইসলাম ধ্বংসে সহযোগিতা করে। আর সহযোগিতাকারীর প্রতি আল্লাহ, ফিরিশতা ও সমগ্র মানবজাতির লা‘নত বর্ষিত হয়। (ছহীহ্ বুখারী, হা/১৮৭০)
(২) বিদ‘আতীদের জন্য রাসূল (স) শাফা‘আত করবেন না। তিনি (স) বলেন, আমি তোমাদের পূর্বেই হাউযে কাওছারের নিকট পৌঁছে যাব। যে ব্যক্তি আমাকে অতিক্রম করবে, সে উহার পানি পান করবে। আর যে একবার উহার পানি পান করবে, সে কখনোই তৃষ্ণার্ত হবে না। এই সময় আমার নিকটে বহু সংখ্যক লোক উপস্থিত হবে যাদেরকে আমি চিনব এবং তারাও আমাকে চিনবে। কিন্তু আমার ও তাদের মধ্যে পর্দা ফেলে দেয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার উম্মত! তখন বলা হবে, আপনি জানেন না, আপনার পরে এরা কি বিদ‘আত সৃষ্টি করেছিল। একথা শুনে আমি বলব: ‍ছুহ্কান, ছুহ্কান লিমান গাইয়ারা বা‘দী- দূর হও! দূর হও! যারা আমার পরে আমার দ্বীনকে বিকৃত করেছ। (ছহীহ্ বুখারী, হা/৬৫৮৩)

প্রচলিত বিদ‘আতসমূহ

  • মৃত ব্যক্তি কেন্দ্রিক বিদ‘আতসমূহ
  1. মৃতের জন্য কুলখানি (মৃত্যু দিনেই খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন  অথবা ৩ দিনা, ৭দিনা বা চল্লিাশা করা কিংবা বছরান্তে মৃত্য দিবস উপলক্ষে এ জাতীয় কিছু করা।)
  2. মৃত ব্যক্তির পাশে বসে লোকদের ডেকে বা ভাড়া করে এনে  কুরআন পড়ানো বা সবিনা খতন করানো।
  3. চিৎকার দিয়ে কান্নাকাটি করা, বুক চাপড়ানো, কাপড় ছেঁড়া ইত্যাদি।
  4. মাসজিদের মাইকে এবং পথে ঘাটে মাইংকিং করে মৃত্যু সংবাদ প্রচার করা।
  5. মৃত ব্যক্তিকে গোসলের সময় ভিন্ন ভিন্ন অঙ্গ ধৌত করার সময় ভিন্ন ভিন্ন দো’আ পড়া।
  6. লাশের নিকট ভিড় করা।
  7. কাফনের কাপড়ে কুরআনের আয়াত বা কোন দোয়া-কালেমা লিখে দেয়া।
  8. জানাযার পিছনে উচ্চস্বরে যিকর ও তিলাওয়াত করা।
  9. জানাযা শুরুর প্রাক্কালে মায়্যেত কেমন ছিলেন বলে লোকদের নিকট হতে সাক্ষ্য গ্রহণ করা এবং জানাযার জন্য মাঠে নিয়ে গিয়ে লাশ সামনে রেখে বক্তব্য দিয়ে কালক্ষেপন করা।
  10. জুতা পাক থাকা সত্ত্বেয় জুতা খোলা বা জুতা খুলে উহার উপরে দাঁড়ানো।
  11. কবরে তিন মুষ্ঠি মাটি বিশেষ পদ্ধতিতে (তথা মিনহা খালাক্বনাকুম... এই দো’আ পড়) দেওয়া। যা সহীহ্ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত নয়।
  12. দাফনের পর বা অন্য যে কোন সময় কবস্থানে সম্মিলিত মোনাজাত করা।
  13. কবরে বা মাজারে মানত, সিজদা করা (এটি শিরক এবং হারাম), কবরবাসীর নিকট কিছু চাওয়া।
  14. কবর পাকা করা ও আলোকসজ্জা করা।
  15. কবরে ফুল দেয়া।
  16. শোক দিবস, শোক সভা ইত্যাদি পালন এবং এ উপলক্ষে কাঙ্গালী ভোজ বা খানাপিনার আয়োজোন কর।
  17. কবরের কাছে বসে কুরআন তিলাওয়াত বা খতম করা।
  18. কবরের উপরে সামিয়ানা টাঙ্গানো।
  19. কোন দিন বা রাতকে যিয়ারতের জন্য নিদির্ষ্ট করা। যেমন- প্রতি জুম’আ, শবে বরাত, শবে মিরাজ বা অন্য কোন বিশেষ দিন।
  20. কবরের সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ানো।
  21. কবরকে সুন্দর বা আকর্ষণীয় করা।
  22. কবরে চুম্বন করা
  23. বরকত মনে করে কবরের গায়ে হাত বা শরীরের অন্য কোন অঙ্গ লাগানো।
  24. কবরের গায়ে মৃত ব্যক্তির নাম ও মৃত্যুর তারিখ লেখা।
  25. দাফন-কাফনের কাজ কে নেকীর কাজ মনে না করে পয়সার বিনিময়ে কাজ করা।
  26. ছালাত-ছিয়াম, তিলাওয়াত ইত্যাদি ইবাদত করে মৃত ব্যক্তির নামে হাদিয়া পাঠানো।
  27. কবস্থানে ওরস করা এবং এ উপলক্ষে খিচুড়ী বা এই জাতীয় খাবারের আয়োজন করে তা তাবাররুক বা বরকতময় মনে করে খাওয়া।
  28. কোন কবর বা মাজারের উদ্দেশ্যে টাকা-পয়সা হাদিয়া গরু-ছাগল ইত্যাদি মান্নত করা।
  29. কবরে খেজুর ডালা পোতা বা গাছ লাগানো এই ভেবে যে, এতে মৃত ব্যক্তির আযাব হালকা হবে। 
  30. খাটিয়া বা মৃত দেহ ঢাকা দেয়ার কাপড় সুন্দর, আকর্ষণীয় বা কালিমা ত্বায়্যিবা খচিত করা।

  • বিয়ে সংক্রান্ত বিদ‘আতসমূহ

  1. বিয়েতে নাচ-গান, হলুদ মাখানো, রং-তামশা করা।
  2. অনেক বেশি মহরানা বাঁধা। 
  3. যৌতুক নেয়া এবং দেয়া।
  4. বিয়ে উপলক্ষে বরপক্ষের অনেক লোকজন নিয়ে কন্যা পক্ষের  বাড়িতে যাওয়া।
  5. বিয়ে ও অন্যান্য অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের একত্রে খাওয়ার আয়োজন করা।
  6. গিফট আদান-প্রদানকে জরুরী মনে করা বা চেয়ার টেবিল নিয়ে বসে নাম লিষ্ট করে তা আদায় করা।
  7. গেট ধরা, হাত ধোয়ানো বা এই জাতীয় কিছু করে চাঁদা বাজী করা।
  8. ছবি তোলা এবং ভিডিও ধারণ করা।
  9. উকিল বাবা বানানো।
  10. বিয়ে পরবর্তী বিভিন্ন রুসম-রেওয়াজ বা  পর্ব পালন করা।
  11. বউ দেখিয়ে টাকা নেওয়া, বউ ভাত, বউ গোসল, নতুন বৌকে দিয়ে বিশেষ কাজ করানো ইত্যাদি।

  • অন্যান্য বিদ‘আতসমূহ

  1. মিলাদ বা ঈদে মিলাদুন্নবী পালন করা।
  2. শবে বারাত, শবে মিরাজে রাত জেগে বিশেষ নিয়মে ইবাদত, বা ওয়াজ করা ও পরের দিন সাওম পালন করা এবং  মহররম মাসে তাজিয়া মিছিল, মাতন ইত্যাদি করা।
  3. সব ধরণের দিবস পালন (ধর্মের নামে ও জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কোন নিয়ম পালনার্থে কোন দিবস পালন করা)।
  4. অনেক হাঁক-ডাক করে আকিকা অনুষ্ঠান করা এবং গিফট নেওয়া।
  5. সুন্নাতে খাৎনা উপলক্ষে বিশেষ বড় আয়োজন করা বা জরুরী মনে করা।
  6. ফরজ সালত শেষে, মাহফিল শেষে, বিয়ে শেষে, কোন কাজের উদ্বোধনে বা সমাপনে এবং গোরস্থানে গিয়ে সম্মিলিত মোনাজাত করা।  
  7. ফরজ সালাত শেষে মাসনূন যিকর-আযকার না করে দ্রুত উঠে সুন্নাত সালাত শুরু করা বা মাসজিদ ত্যাগ করা।
  8. মাসজিদে প্রবেশের পর কোন সালাত না পড়েই বসে যাওয়া।
  9. খুতবা চলাকালে বা অন্য কোন সময়ে এমন বাতি জ্বালানো যাতে লিখা থাকে এখন সুন্নাত বন্ধ রাখুন।
  10. আযানের পূর্বে ও পরে অন্য কিছু পড়া বা বলা। যেমন অনেক মুয়াজ্জিনই ফজরের আজানের পূর্বেই আস্সালাতু খাইরুম মিনান্নাওম্ বলে ডাকাডাকি করেন, কুরআন তিলাওয়াত করেন, গজল বা ইসলামী সংগীত বলেন বা বাজান।
  11. দুই ঈদ ও জুম‘আর সালাতে ২ এর অধিক খুতবা দেয়া। যেমন অনেকেই দেয়-বাংলায় একটি (তাও আবার বসে বসে?) এবং আরবীতে দুইটি।
  12. জুম‘আর সালাতে ২ বার আযান দেয়া। তথা একটি ডাক আযান এবং একটি খুতবার আযান। এ বিষয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনা প্রয়োজন।

জুম‘আর আজান

জুম‘আর আজানের সঠিক নিয়ম হলো, খত্বীব সাহেব মিম্বরে বসার পরে মুওয়াজ্জিন জুম‘আর আযান দিবেন। রাসূল (স), আবুবকর ও ওমর (রা) এর যুগে এবং ওছমান (রা)-এর খেলাফতের প্রথমার্ধ্বে এই নিয়ম চালুু ছিল। অতঃপর মুসলমানের সংখ্যা ও নগরীর ব্যস্ততা বেড়ে গেলে হযরত ওছমান (রা) জুম‘আর পূর্বে মসজিদে নববী থেকে দূরে ‘যাওরা’ বাজারে একটি বাড়ির ছাদে দাঁড়িয়ে লোকদের আগাম হুঁশিয়ার করার জন্য পৃথক একটি আযানের নির্দেশ দেন। (বুখারী, মিশকাত হা/১৪০৪)
খলিফার এই হুকুম ছিল স্থানিক প্রয়োজনের কারণে একটি সাময়িক মাত্র। সেকারণে মক্কা, কূফা ও বছরা সহ ইসলামী খেলাফতের বহু গুরুত্বপূর্ণ শহরে এ আযান তখন চালু হয়নি। ওছমান (রা) এটাকে সর্ব
ত্র চালু করার প্রয়োজন মনে করেননি বা উম্মতকে বাধ্য করেননি। তাই সর্বত্র  এই নিয়ম চালু করার পিছনে কোন যুক্তি নেই। তাছাড়া রাসূল (স)-এর আচরিত সুন্নাতের অনুসরণই সকল মুমিনের কর্তব্য।

ইবনু আব্দিল বার্র বলেন, খত্বীব মিম্বরে বসার পরে সম্মুখ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে যে আযান দেয়া হয় (যা ইসলামের স্বর্ণযুগে চালু ছিল), এটাই সঠিক। এর বাইরে মিম্বরের নিকটে, খত্বীবের সম্মুখে দাঁড়িয়ে আযান দেওয়া বিষয়ে একটি বর্ণও প্রমাণিত নয়। (আওনুল মা’বুদ ৩/৪৩৭; সালাতুর রাসূল, হাদীস  ফাউন্ডেশন, পৃ-১৯৫)
উল্লেখ্য, যারা এটাকে সুন্নাতে ওছমানী মনে করেন তর্কের খাতিরে ধরুণ আপনার কথা আমি মেনে নিলাম, এখন বলুন- যে প্রক্রিয়ায় ওছমানা (রা) ডাক আযানের ব্যবস্থা করেছিলেন বর্তমানে কি সেই প্রক্রিয়ায় হয়? উনি দিতে বলেছিলেন বাজারে, আপনি দিচ্ছেন মাসিজিদেই। তখন মাইক-স্পিকারের ব্যবস্থা না থাকায় তিনি উহা করেছিলেন। এখন কি সেই সমস্যা আছে? নাই। নাই দেখেই তো ২য় আযানকে আযান মনেই হয় না। কারণ, তা দেয়া হয় খত্বীব সাহেবের এখখেবারে নাকের ডগায় এবং খুব আস্তে আস্তে। এটা আবার কোন সুন্নাত? আযান তো মানুষকে আহবানের জন্য। তাহলে মাইক বাদ দিয়ে মুখে মুখে কেন? দুটো আযনই মাইকে হওয়া উচিত ছিল না কি? বিবেকবানমাত্রই বলবেন, কথাটি সত্যিই চিন্তা করার দরকার। তাই আসুন! রাসূল (স) এর হারানো সুন্নাতসমূহ যেন্দা করি এবং বিদ‘আতসমূহ পরিত্যাগ করি। 

উল্লেখ্য যে, বিদ্‌আত হলো সুন্নাতের বিপরীত। আর রাসূল (স)-এর সুন্নাত মোতাবেক আমল করার ফযিলত ও গরুত্ব অত্যন্ত বেশি। এমর্মে-
রাসূল (স) একটি হাদীসে বলেন:

إنَّ مِن ورائكم زمانَ صَبْرٍ لِلْمُتَمَسِّكِ فيه أجرُ خمسين شهيدَا منكم

“তোমাদের পরে এমন একটা কষ্টকর সময় আসছে, যখন সুন্নাতকে দৃঢ়ভাবে ধারণকারী ব্যক্তি তোমাদের মধ্যকার পঞ্চাশ জন শহীদের নেকী পাবে।” (ছহহুল জামে হা/২২৩৪)

মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে সহীহ্ বুঝ দান করুন এবং আল্ কুরআন ও সহীহ্ হাদীস মোতাবেক আমল করার তৌফিক দানে ধন্য করুন! আ-মী-ন!

Visit Our English Site Click Here 



Thanks for reading. جزاك الله خيرا

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url