সূরা আল ক্বালম-এর তাফসীর -১ম পর্ব
![]() |
সূরাঃ ৬৮/ আল-ক্বালম | আয়াতঃ ৫২
| মাক্কী
بِسْمِ
اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
نٓ وَ الۡقَلَمِ وَ
مَا یَسۡطُرُوۡنَ ۙ﴿۱﴾
১.
নূন—শপথ
কলমের(১) এবং তারা যা লিপিবদ্ধ করে তাঁর,
(১) মুজাহিদ বলেন, কলম মানে যে কলম দিয়ে
যিকর অর্থাৎ কুরআন মজীদ লেখা হচ্ছিলো। [কুরতুবী]
কলম সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “সর্বপ্রথম আল্লাহ তা’আলা কলম সৃষ্টি করে তাকে লেখার আদেশ করেন।
কলম বলল,
কী লিখব? তখন আল্লাহ বললেন, যা হয়েছে এবং যা হবে তা সবই লিখ। কলম আদেশ অনুযায়ী অনন্তকাল পর্যন্ত
সম্ভাব্য সকল ঘটনা ও অবস্থা লিখে দিল।” [মুসনাদে আহমাদ:
৫/৩১৭]
অন্য হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহ তা'আলা সমগ্র সৃষ্টির তাকদীর আকাশ ও পৃথিবী
সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে লিখে দিয়েছিলেন।” [মুসলিম: ২৬৫৩, তিরমিযী: ২১৫৬, মুসনাদে আহমাদ: ২/১৬৯]
কুরআনের অন্যত্রও এ কলমের উল্লেখ করা হয়েছে। বলা হয়েছে, “তিনি (আল্লাহ) কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন”।
[সূরা আল-আলাক: ৪]
مَاۤ اَنۡتَ بِنِعۡمَۃِ رَبِّکَ
بِمَجۡنُوۡنٍ ۚ﴿۲﴾
২.
আপনার রবের অনুগ্রহে আপনি উন্মাদ নন
[একইভাবে সূরা তাকবীর এর ২২ নং আয়াতে
আল্লাহ বলেন-
وما صاحبُكم بمجنون
‘আর তোমাদের সাথী পাগল নন।’]
وَ اِنَّ لَکَ لَاَجۡرًا غَیۡرَ
مَمۡنُوۡنٍ ۚ﴿۳﴾
৩. আর নিশ্চয় আপনার জন্য রয়েছে নিরবচ্ছিন্ন পুরস্কার,
وَ اِنَّکَ لَعَلٰی خُلُقٍ عَظِیۡمٍ ﴿۴﴾
৪.
আর নিশ্চয় আপনি মহান চরিত্রের উপর রয়েছেন।(১)
(১) আয়াতে উল্লেখিত, “মহৎ চরিত্র” এর অর্থ নির্ধারণে কয়েকটি মত বর্ণিত আছে।
১. ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু
আনহুমা বলেন, মহৎ চরিত্রের অর্থ মহৎ দ্বীন। কেননা, আল্লাহ তা'আলার কাছে ইসলাম অপেক্ষা অধিক
প্রিয় কোনো দ্বীন নেই।
২. আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা
বলেন, স্বয়ং কুরআন
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর “মহৎ চরিত্র”। অর্থাৎ
কুরআন পাক যেসব উত্তম কর্ম ও চরিত্র শিক্ষা দেয়, তিনি সেসবের বাস্তব নমুনা।
৩. আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “মহৎ চরিত্র” বলে কুরআনের শিষ্টাচার
বোঝানো হয়েছে; অর্থাৎ যেসব শিষ্টাচার
কুরআন শিক্ষা দিয়েছে। [কুরতুবী]
*
আমাদের প্রিয় নাবী (স)-এর চরিত্র
সম্পর্কে মহান আল্লাহ সূরা আলে ইমরানের ১৫৯ আয়াতে বলেন, فبما رحمةٍ من الله لِنْتَ لهم ولو كنت فظا غليظ القلب لا نفضوا من
حولك...
* কমলতা সম্পর্কে জাবির (রা) বলেন, নাবী (স) বলেছেন, “مَنْ يُحْرٍمِ الرِفْقَ يُحرَمِ
الخيرَ"
অর্থ- যাকে কোমলতা ও নম্রতা
হতে বঞ্চিত করা হয়,
তাকে যাবতীয় কল্যাণ হতে বঞ্চিত করা হয়। (সহীহ মুসলিম,
মিশকাত হা/৫০৭১)
* রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নৈতিক চরিত্রের সর্বোত্তম সংজ্ঞা দিয়েছেন
আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা। তিনি বলেছেন, কুরআনই ছিল তার চরিত্র। [মুসনাদে আহমাদ: ৬/৯১]
* আনাস
রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বৰ্ণনা করেছেন, “আমি দশ বছর যাবত রাসূলুল্লাহর খেদমতে নিয়োজিত ছিলাম। আমার কোন কাজ সম্পর্কে
তিনি কখনো উহ! শব্দ পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি। আমার কোন কাজ দেখে কখনো বলেননি, তুমি এ কাজ করলে কেন? কিংবা কোন কাজ না করলে
কখনো বলেননি, তুমি এ কাজ করলে না
কেন? [বুখারী: ৬০৩৮, মুসলিম: ২৩০৯]
* রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সত্তায় আল্লাহ তা'আলা যাবতীয় উত্তম চরিত্র পূর্ণমাত্রায় সন্নিবেশিত করে দিয়েছিলেন। তিনি
নিজেই বলেন, “আমি উত্তম চরিত্রকে
পূর্ণতা দান করার জন্যই প্রেরিত হয়েছি। [মুসনাদে আহমাদ: ২/৩৮১, মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৬৭০]
فَسَتُبۡصِرُ وَ
یُبۡصِرُوۡنَ ۙ﴿۵﴾
৫.
অতঃপর অচিরেই আপনি দেখবেন এবং তারাও দেখবে—
بِاَىیِّکُمُ الۡمَفۡتُوۡنُ ﴿۶﴾
৬.
তোমাদের মধ্যে কে বিকারগ্ৰস্ত(১)।
(১) مَفْتُون শব্দের অর্থ এস্থলে
বিকারগ্রস্ত পাগল। [বাগভী]
اِنَّ رَبَّکَ هُوَ
اَعۡلَمُ بِمَنۡ ضَلَّ عَنۡ سَبِیۡلِهٖ ۪ وَ هُوَ اَعۡلَمُ بِالۡمُهۡتَدِیۡنَ ﴿۷﴾
৭. নিশ্চয় আপনার রব সম্যক অবগত আছেন কে
তাঁর পথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং তিনি সম্যক জানেন তাদেরকে, যারা হিদায়াতপ্রাপ্ত।
فَلَا تُطِعِ
الۡمُکَذِّبِیۡنَ ﴿۸﴾
৮.
কাজেই আপনি মিথ্যারোপকারীদের আনুগত্য করবেন না।
وَدُّوۡا لَوۡ
تُدۡهِنُ فَیُدۡهِنُوۡنَ ﴿۹﴾
৯.
তারা কামনা করে যে, আপনি আপোষকামী হোন, তাহলে তারাও আপোষকামী হবে,
অর্থাৎ, তারা তো এটাই চায় যে, তুমি তাদের উপাস্যগুলোর ব্যাপারে একটু নম্র ভাব প্রকাশ কর, তাহলে তারাও তোমার ব্যাপারে নম্র ভাব অবলম্বন করবে। কিন্তু বাতিলের ব্যাপারে শিথিলতার ফল এই হবে যে, বাতিল পন্থীরা তাদের বাতিলের পূজা ছাড়তে ঢিলেমি করবে। কাজেই সত্যের ব্যাপারে শিথিলতা (দ্বীন) প্রচারের কৌশল এবং নবুঅতের দায়িত্ব পালনের কাজের জন্য বড়ই ক্ষতিকর। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
