সূরা মুদ্দাসির-এর তাফসীর-Tasir of Sura Al-Muddathir
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
یٰۤاَیُّهَا
الۡمُدَّثِّرُ ۙ﴿۱﴾
১. হে বস্ত্ৰাচ্ছাদিত!(১)
Ø (১) হাদীসে এসেছে, সর্বপ্রথম হেরা গিরি গুহায় রাসূলুল্লাহ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে ফেরেশতা জিবরীল আগমন করে ইকরা সূরার
প্রাথমিক আয়াতসমূহ পাঠ করে শোনান। ফেরেশতার এই অবতরণ ও ওহীর তীব্ৰতা প্রথম
পর্যায়ে ছিল। ফলে এর স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম খাদিজা রাদিয়াল্লাহু আনহার নিকট গমন করলেন এবং তার কাছে
বিস্তারিত ঘটনা বর্ণনা করলেন।
Ø এরপর বেশ
কিছুদিন পর্যন্ত ওহীর আগমন বন্ধ থাকে। বিরতির এই সময়কালকে “ফাতরাতুল ওহী”
বলা হয়।
Ø রাসূলুল্লাহ্
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাদীসে এই সময়কালের উল্লেখ করে বলেন,
একদিন আমি পথ
চলা অবস্থায় হঠাৎ একটি আওয়াজ শুনে আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখি,
হেরা গিরিগুহার
সেই ফেরেশতা আকাশ ও পৃথিবীর মাঝখানে এক জায়গায় একটি ঝুলন্ত চেয়ারে উপবিষ্ট
রয়েছেন। তাকে এই আকৃতিতে দেখে আমি প্রথম সাক্ষাতের ন্যায় আবার ভীত ও আতংকিত হয়ে
পড়লাম। আমি গৃহে ফিরে এলাম এবং গৃহের লোকজনকে বললাম,
আমাকে
বস্ত্ৰাবৃত করে দাও। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াত নাযিল হল। [বুখারী: ৪,
মুসলিম: ১৬১]
قُمۡ فَاَنۡذِرۡ ۪ۙ﴿۲﴾
২. উঠুন, অতঃপর সতর্ক
করুন(১),
Ø (১) এখানে সর্বপ্রথম নির্দেশ হচ্ছে, قُمْ অর্থাৎ
উঠুন। এর আক্ষরিক অর্থ ‘দাঁড়ান’ও হতে পারে। অর্থাৎ আপনি বস্ত্ৰাচ্ছাদন
পরিত্যাগ করে দন্ডায়মান হোন। এখানে কাজের জন্যে প্রস্তুত হওয়ার অর্থ নেয়াও
অবান্তর নয়। উদ্দেশ্য এই যে, এখন আপনি সাহস করে জনশুদ্ধির দায়িত্ব
পালনে সচেষ্ট হন। [তাফসীরে জাকারিয়া]
وَ رَبَّکَ فَکَبِّرۡ ۪﴿ۙ۳﴾
৩. আর আপনার রবের শ্রেষ্ঠত্ব
ঘোষণা করুন।
وَ ثِیَابَکَ فَطَهِّرۡ ۪﴿ۙ۴﴾
৪. আর আপনার পরিচ্ছদ পবিত্র
করুন(১),
Ø (১) এখানে বর্ণিত ثياب
শব্দটি ثوب এর
বহুবচন। এর আসল ও আক্ষরিক অর্থ কাপড়। কখনও কখনও অন্তর,
মন,
চরিত্র ও
কর্মকেও বলা হয়। এটি একটি ব্যাপক অর্থবোধক কথা। এর একটি অর্থ হল,
আপনি আপনার
পোশাক-পরিচ্ছদ নাপাক বস্তু থেকে পবিত্ৰ রাখুন। কারণ শরীর ও পোশাক-পরিচ্ছদের
পবিত্রতা এবং ‘রূহ’ বা আত্মার পবিত্ৰতা ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
[সা'দী]
Ø সুতরাং
নির্দেশের অর্থ হবে এই যে, আপন পোশাক ও দেহকে বাহ্যিক অপবিত্রতা
থেকে পবিত্র রাখুন এবং অন্তর ও মনকে ভ্রান্ত বিশ্বাস ও চিন্তাধারা থেকে এবং
কুচরিত্র থেকে মুক্ত রাখুন। আল্লাহ তা’আলা পবিত্ৰতা পছন্দ করেন। এক আয়াতে আছে, (إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ
التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ) [সূরা আল বাকারাহ: ২২২]
Ø তাছাড়া হাদীসে ‘পবিত্রতাকে ঈমানের অর্ধাংশ’
[মুসলিম: ২২৩]
বলা হয়েছে।
Ø তাই মুসলিমকে
সর্বাবস্থায় শরীর, স্থান ও পোশাককে বাহ্যিক নাপাকী থেকে এবং অন্তরকে
আভ্যন্তরীণ অশুচি, যেমন লোক-দেখানো, অহংকার ইত্যাদি থেকে পবিত্র রাখার প্রতি
সচেষ্ট হতে হবে। [সা’দী, তাফসীরে জাকারিয়া]
وَ الرُّجۡزَ فَاهۡجُرۡ ۪﴿ۙ۵﴾
৫. আর শির্ক পরিহার করে
চলুন(১),
Ø (১) আয়াতে উল্লেখিত الرجز
শব্দের এক অর্থ,
শাস্তি। অর্থাৎ
শাস্তিযোগ্য কাজ। [ফাতহুল কাদীর]
Ø এখানে এর অর্থ
হতে পারে, পৌত্তলিকতা ও প্রতিমা পূজা। তাছাড়া সাধারণভাবে সকল গোনাহ ও
অপরাধ বোঝানোর জন্যও শব্দটি ব্যবহৃত হতে পারে। তাই আয়াতের অর্থ এই যে,
প্রতিমা পূজা,
শাস্তিযোগ্য
কর্মকাণ্ড অথবা গোনাহ পরিত্যাগ করুন। সকল প্রকার ছোট ও বড় অন্যায় ও গুনাহের কাজ
পরিত্যাগ করুন। [সা’দী, তাফসীরে জাকারিয়া]
وَ لَا تَمۡنُنۡ تَسۡتَکۡثِرُ ۪﴿ۙ۶﴾
৬. আর বেশী পাওয়ার
প্রত্যাশায় দান করবেন না।(১)
Ø (১) এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। একটি অর্থ হলো,
আপনি যার প্রতিই
ইহসান বা অনুগ্রহ করবেন, নিঃস্বাৰ্থভাবে করবেন। আপনার অনুগ্রহ ও
বদ্যান্যতা এবং দানশীলতা ও উত্তম আচরণ হবে একমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যে। ইহসান বা
মহানুভবতার বিনিময়ে কোন প্রকার পার্থিব স্বাৰ্থ লাভের বিন্দুমাত্র আকাঙ্খাও করবেন
না; বেশি পাওয়ার আশায়ও ইহসান করবেন না। দ্বিতীয় অর্থ হলো,
নবুওয়াতের যে
দায়িত্ব আপনি পালন করছেন এবং এর বিনিময়ে কোন প্রকার ব্যক্তি স্বাৰ্থ উদ্ধার
করবেন না; যদিও অনেক বড় ও মহান একটি কাজ করে চলেছেন। কিন্তু নিজের
দৃষ্টিতে নিজের কাজকে বড় কাজ বলে কখনো মনে করবেন না এবং কোন সময় এ চিন্তাও যেন
আপনার মনে উদিত না হয় যে, নবুওয়াতের দায়িত্ব পালন করে আর এ কাজে
প্রাণপণ চেষ্টা-সাধনা করে আপনি আপনার রবের প্রতি কোন অনুগ্রহ করছেন। [দেখুন:
কুরতুবী]
وَ لِرَبِّکَ فَاصۡبِرۡ ؕ﴿۷﴾
৭. আর আপনার রবের জন্যেই ধৈর্য
ধারণ করুন।
فَاِذَا نُقِرَ فِی النَّاقُوۡرِ ۙ﴿۸﴾
৮. অতঃপর যখন শিংগায় ফুঁক
দেয়া হবে(১),
Ø (১)ناقور শব্দের
অর্থ শিংগা এবং نُقِرَ
বলে শিংগায় ফুঁ
দিয়ে আওয়াজ বের করা বোঝানো হয়েছে।
Ø এখানে শিঙ্গার
দ্বিতীয় ফুঁ তথা কবর থেকে উঠে হাশরের ময়দানে জড়ো হওয়ার জন্য যে ফুঁক দেয়া হবে
তা উদ্দেশ্য। [বাগভী, সা'দী, তাফসীরে জাকারিয়া]
فَذٰلِکَ یَوۡمَئِذٍ یَّوۡمٌ عَسِیۡرٌ ۙ﴿۹﴾
(৯) সেদিন হবে এক
সংকটের দিন।
عَلَی الۡکٰفِرِیۡنَ غَیۡرُ یَسِیۡرٍ ﴿۱۰﴾
১০. যা কাফিরদের জন্য সহজ
নয়।(১)
Ø (১) এ বাক্যটি থেকে স্বতঃই প্রতিভাত হয় যে,
সেদিনটি
ঈমানদারদের জন্য হবে খুবই সহজ এবং এর সবটুকু কঠোরতা সত্যকে অমান্যকারীদের জন্য
নির্দিষ্ট হবে। [সা’দী]
ذَرۡنِیۡ وَ مَنۡ خَلَقۡتُ وَحِیۡدًا ﴿ۙ۱۱﴾
১১. ছেড়ে দিন আমাকে ও যাকে
আমি সৃষ্টি করেছি একাকী।(১)
Ø (১) একথাটির দু'টি অর্থ হতে পারে এবং দু'টি অর্থই সঠিক। এক. আমি যখন তাকে সৃষ্টি
করেছিলাম সে সময় সে কোন প্রকার ধন-সম্পদ, সন্তান-সন্ততি এবং মর্যাদা ও নেতৃত্বের
অধিকারী ছিল না, সে একা ছিল। আমি তাকে সেসব দান করেছি। দুই. একমাত্র আমিই
তার সৃষ্টিকর্তা। অন্য যেসব উপাস্যের প্রভুত্ব কায়েম রাখার জন্য সে আপনার দেয়া
তাওহীদের দাওয়াতের বিরোধিতায় এত তৎপর, তাদের কেউই তাকে সৃষ্টি করার ব্যাপারে
আমার সাথে শরীক ছিল না। [কুরতুবী]
وَّ جَعَلۡتُ لَهٗ مَالًا مَّمۡدُوۡدًا ﴿ۙ۱۲﴾
১২. আর আমি তাকে দিয়েছি বিপুল
ধন-সম্পদ(১),
Ø (১) কেয়ামত দিবস সকল কাফেরের জন্যেই কঠিন হবে-একথা বর্ণনা
করার পর জনৈক দুষ্টমতি কাফেরের অবস্থা ও তার কঠোর শাস্তি বর্ণিত হয়েছে।
Ø কোন কোন
বর্ণনায় এসেছে যে, তার নাম ওলীদ ইবনে মুগীরা। তার দশ বারটি পুত্ৰ সন্তান ছিল।
তাদের মধ্যে খালেদ ইবনে
ওয়ালীদ ইতিহাসে অনেক বেশী প্রসিদ্ধি লাভ করেছিলেন। আল্লাহ তা'আলা তাকে ধনৈশ্বর্য ও সন্তান-সন্তুতির
প্রাচুর্য দান করেছিলেন। [ইবন কাসীর]
Ø ইবনে আব্বাস
রাদিয়াল্লাহু আনহুমার ভাষায়, তার ফসলের ক্ষেত ও বাগ-বাগিচা মক্কা থেকে
তায়েফ পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এমনকি তার ক্ষেতের ফসল ও বাগানের আমদানী সারা বছর তথা
শীত ও গ্ৰীষ্ম সব ঋতুতে অব্যাহত থাকত। তাকে আরবের সরদার গণ্য করা হত। জনসাধারণের
মধ্যে তার বিশেষ বিশেষ উপাধি ছিল। সে গর্ব ও অহংকারবশতঃ নিজেকে ওহীদ ইবনুল-ওহীদ অর্থাৎ এককের পুত্র
একক বলত। তার দাবী ছিল এই যে, সম্প্রদায়ের মধ্যে সেও তার পিতা মুগীরা
অদ্বিতীয়। [কুরতুবী, বাগভী]
وَّ بَنِیۡنَ شُهُوۡدًا ﴿ۙ۱۳﴾
১৩. এবং নিত্যসঙ্গী পুত্ৰগণ(১),
Ø (১) এসব পুত্ৰ সন্তানদের জন্য شهود শব্দ
ব্যবহার করা হয়েছে। এর কয়েকটি অর্থ হতে পারে। এক,
রুযী রোজগারের
জন্য তাদের দৌড় ঝাপ করতে বা সৰ্বক্ষণ ব্যস্ত থাকতে কিংবা বিদেশ যাত্রা করতে হয়
না। তাদের বাড়ীতে এত খাদ্য মজুদ আছে যে, তারা সর্বক্ষণ বাপের কাছে উপস্থিত থাকে।
বরং তাকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত থাকে। [ইবন কাসীর]
Ø কেউ বলেন,
তারা ছিল ১২ জন।
আবার কেউ বলেন, তারা ছিল ১৩ জন।
Ø তাদের মধ্যে ৩
জন ইসলাম গ্রহণ করেছিল। তাঁরা হলেন- খালেদ, হিশাম এবং অলীদ বিন অলীদ (রাঃ)। (ফাতহুল
ক্বাদীর)
وَّ مَهَّدۡتُّ لَهٗ تَمۡهِیۡدًا ﴿ۙ۱۴﴾
(১৪) অতঃপর তাকে খুব
প্রশস্ততা দিয়েছি। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, মাল-ধনে,
নেতৃত্ব ও
সর্দারীতে এবং বয়সে।
ثُمَّ
یَطۡمَعُ اَنۡ اَزِیۡدَ ﴿٭ۙ۱۵﴾
১৫. এর পরও সে কামনা করে যে,আমি তাকে আরও বেশী
দেই!(১)
Ø [1] অর্থাৎ, কুফরী ও অবাধ্যতা করা সত্ত্বেও সে চায় যে,
তাকে আমি আরো
অধিক দিই। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
کَلَّا ؕ اِنَّهٗ کَانَ لِاٰیٰتِنَا عَنِیۡدًا ﴿ؕ۱۶﴾
(১৬) কক্ষনই না,[1] সে তো আমার
নিদর্শনসমূহের বিরুদ্ধাচারী।[2]
Ø [1] অর্থাৎ, আমি তাকে বেশী দেব না।
Ø [2] এটা كَلاَّ
(না দেওয়া) এর কারণ। عَنِيْدٌ
সেই ব্যক্তিকে
বলা হয়, যে জানা সত্ত্বেও সত্যের বিরোধিতা এবং তা প্রত্যাখ্যান করে। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
سَاُرۡهِقُهٗ صَعُوۡدًا ﴿ؕ۱۷﴾
(১৭) আমি অচিরেই
তাকে ক্রমবর্ধমান শাস্তি দ্বারা আচ্ছন্ন করব।[1]
Ø [1] অর্থাৎ, এমন আযাবে পতিত করব,
যা সহ্য করা
খুবই কঠিন হবে। কেউ কেউ বলেন, জাহান্নামে আগুনের পাহাড় হবে,
যাতে তাকে চড়ানো
হবে। إِرْهَاقٌ
এর অর্থ হল,
মানুষের উপর কোন
ভারী জিনিস চাপিয়ে দেওয়া। (ফাতহুল ক্বাদীর, তাফসীরে আহসানুল বায়ান)
اِنَّهٗ فَکَّرَ وَ قَدَّرَ ﴿ۙ۱۸﴾
(১৮) সে তো চিন্তা
করল এবং সিদ্ধান্ত করল। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, কুরআন এবং নবী (সাঃ)-এর বার্তা শুনে সে এ
ব্যাপারে চিন্তা-ভাবনা করল যে, আমি এর উত্তর কি দেব?
আর মনে মনে সে
উত্তর প্রস্তুত করল। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
فَقُتِلَ کَیۡفَ قَدَّرَ ﴿ۙ۱۹﴾
(১৯) ধ্বংস হোক সে!
কেমন করে সে এই সিদ্ধান্ত করল!
ثُمَّ قُتِلَ کَیۡفَ قَدَّرَ ﴿ۙ۲۰﴾
(২০) আবার ধ্বংস হোক
সে! কেমন করে সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হল! [1]
Ø [1] এই বাক্যগুলো তার প্রতি বদ্দুআ স্বরূপ ব্যবহার করা হয়েছে।
ধ্বংস হোক! বিনাশ হোক! এমন কথা সে চিন্তা করেছে?
[তাফসীরে আহসানুল
বায়ান]
ثُمَّ نَظَرَ ﴿ۙ۲۱﴾
(২১) সে আবার চেয়ে
দেখল। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, পুনরায় চিন্তা করল যে,
কুরআনের খন্ডন
কিভাবে সম্ভব?
ثُمَّ عَبَسَ وَ بَسَرَ ﴿ۙ۲۲﴾
(২২) অতঃপর সে
ভ্রূকুঞ্চিত ও মুখ বিকৃত করল। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, উত্তর চিন্তা করার সময় চেহারা বিকৃত করল
এবং ভ্রূ-কুঞ্চিত করল। যেমন, কোন জটিল বিষয়ে চিন্তা করার সময় সাধারণতঃ
মানুষের হয়ে থাকে। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
ثُمَّ اَدۡبَرَ وَ اسۡتَکۡبَرَ ﴿ۙ۲۳﴾
(২৩) অতঃপর সে পিছনে
ফিরল এবং দম্ভ প্রকাশ করল। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল এবং ঈমান আনার
ব্যাপারে অহংকার প্রদর্শন করল। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
فَقَالَ اِنۡ هٰذَاۤ اِلَّا سِحۡرٌ یُّؤۡثَرُ ﴿ۙ۲۴﴾
২৪. অতঃপর সে বলল, এ তো লোক পরম্পরায়
প্রাপ্ত জাদু ভিন্ন আর কিছু নয়।(১)
Ø (১) উদ্দেশ্য এই যে, এই হতভাগা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু
আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওত অস্বীকার করার জন্য অনেক চিন্তা-ভাবনার পর প্রস্তাব
করল, তাকে যাদুকর বলা হোক। এই ঘূণ্য প্রস্তাবের কারণেই আল্লাহ্
তা'আলা কুরআনে তার প্রতি বার বার অভিসম্পাত করেছেন। ইবন কাসীর]
اِنۡ هٰذَاۤ اِلَّا قَوۡلُ الۡبَشَرِ ﴿ؕ۲۵﴾
(২৫) এটা তো
মানুষেরই কথা।
سَاُصۡلِیۡهِ سَقَرَ ﴿۲۶﴾
(২৬) আমি তাকে
নিক্ষেপ করব সাক্বার (জাহান্নামে)।
وَ مَاۤ اَدۡرٰىکَ مَا سَقَرُ ﴿ؕ۲۷﴾
(২৭) কিসে তোমাকে
জানাল,
সাক্বার কী? [1]
Ø [1] দোযখের নাম অথবা তার স্তরসমূহের একটির নাম ‘সাক্বার’। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
لَا تُبۡقِیۡ وَ لَا تَذَرُ ﴿ۚ۲۸﴾
(২৮) ওটা তাদেরকে
(জীবিত অবস্থায়) রাখবে না, আর (মৃত অবস্থায়ও) ছেড়ে দেবে
না। [1]
Ø [1] তাদের শরীরে না গোশত বাকী রাখবে,
আর না হাড়। অথবা
এর অর্থ হল, জাহান্নামীদেরকে না জীবন্ত ছাড়বে,
আর না মৃত। ثم
لاَ يَمُوْتُ فِيْهَا وَلاَ يَحْيَ
لَوَّاحَۃٌ لِّلۡبَشَرِ ﴿ۚۖ۲۹﴾
(২৯) ওটা দেহের
চামড়া দগ্ধ করে দেবে।
عَلَیۡهَا تِسۡعَۃَ عَشَرَ ﴿ؕ۳۰﴾
(৩০) ওর
তত্ত্বাবধানে রয়েছে উনিশ জন প্রহরী। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, জাহান্নামে প্রহরী স্বরূপ ১৯ জন ফিরিশতা
নিযুক্ত থাকবেন। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
وَ مَا جَعَلۡنَاۤ اَصۡحٰبَ النَّارِ اِلَّا مَلٰٓئِکَۃً ۪ وَّ مَا
جَعَلۡنَا عِدَّتَهُمۡ اِلَّا فِتۡنَۃً لِّلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ۙ لِیَسۡتَیۡقِنَ
الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ وَ یَزۡدَادَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِیۡمَانًا وَّ
لَا یَرۡتَابَ الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ وَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ۙ وَ لِیَقُوۡلَ
الَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِهِمۡ مَّرَضٌ وَّ الۡکٰفِرُوۡنَ مَاذَاۤ اَرَادَ اللّٰهُ
بِهٰذَا مَثَلًا ؕ کَذٰلِکَ یُضِلُّ اللّٰهُ مَنۡ یَّشَآءُ وَ یَهۡدِیۡ مَنۡ
یَّشَآءُ ؕ وَ مَا یَعۡلَمُ جُنُوۡدَ رَبِّکَ اِلَّا هُوَ ؕ وَ مَا هِیَ اِلَّا
ذِکۡرٰی لِلۡبَشَرِ ﴿۳۱﴾
৩১. আমি ফিরিশতাদেরকেই করেছি
জাহান্নামের প্রহরী। আর অবিশ্বাসীদের পরীক্ষা স্বরূপই আমি তাদের এই সংখ্যা উল্লেখ
করেছি;[1]
যাতে কিতাবধারীদের দৃঢ় প্রত্যয় জন্মে,[2] বিশ্বাসীদের
বিশ্বাস বর্ধিত হয়[3]
এবং বিশ্বাসীরা ও কিতাবধারীগণ সন্দেহ পোষণ না করে। এর ফলে
যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা ও অবিশ্বাসীরা বলবে, এ বর্ণনায় আল্লাহর
উদ্দেশ্য কি?[4]
এইভাবে আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথভ্রষ্ট করেন এবং যাকে ইচ্ছা পথ
নির্দেশ করেন।[5]
তোমার প্রতিপালকের বাহিনী সম্পর্কে একমাত্র তিনিই জানেন।[6] (জাহান্নামের) এই
বর্ণনা তো মানুষের জন্য উপদেশ বাণী। [7]
Ø [1] এখানে কুরাইশ বংশের মুশরিকদের খন্ডন করা হয়েছে। যখন
জাহান্নামের তত্ত্বাবধায়ক ফিরিশতাদের কথা আল্লাহ উল্লেখ করলেন,
তখন আবূ জাহল
কুরাইশদেরকে সম্বোধন করে বলল, তোমাদের মধ্য থেকে প্রত্যেক দশজনের একটি
দল এক একজন ফিরিশতার জন্য যথেষ্ট নয় কি? কেউ বলেন,
কালাদাহ নামক এক
ব্যক্তি --যার নিজ শক্তির ব্যাপারে বড়ই অহংকার ছিল---সে বলল,
তোমরা কেবল দু’জন ফিরিশতাকে সামলে নিও,
অবশিষ্ট ১৭ জন
ফিরিশতার জন্য আমি একাই যথেষ্ট! বলা হয় যে, এই লোকই রসূল (সাঃ)-কে কয়েকবার কুস্তি
লড়াই করার জন্য চ্যালেঞ্জ করেছিল এবং প্রত্যেক বারই পরাজিত হয়েছিল। কিন্তু ঈমান আনেনি। বলা হয় যে,
এ ছাড়া রুকানা
ইবনে আবদ ইয়াযীদের সাথে তিনি কুস্তি লড়েছিলেন এবং সে পরাজিত হয়ে ইসলাম গ্রহণ
করেছিল। (ইবনে কাসীর) অর্থাৎ, (কুরআনে উল্লিখিত) এই সংখ্যাও তাদের উপহাস
ও বিদ্রূপের বিষয়রূপে পরিণত হল।
Ø [2] অর্থাৎ, জেনে নেয় যে,
এ রসূল (সাঃ)
হলেন সত্য। আর তিনি সেই কথাই বলেন, যা পূর্বের কিতাবসমূহেও লিপিবদ্ধ আছে।
Ø [3] কারণ, আহলে-কিতাবও তাদের পয়গম্বরের কথার
সত্যায়ন করেছে।
Ø [4] অন্তরের ব্যাধিগ্রস্ত বলতে মুনাফিকদেরকে বুঝানো হয়েছে। অথবা
এমন লোক, যাদের অন্তরে সন্দেহ ছিল। কেননা,
মক্কায়
মুনাফেকরা ছিল না। অর্থাৎ তারা জিজ্ঞাসা করবে যে,
আল্লাহর এই
সংখ্যাকে এখানে উল্লেখ করার পিছনে যুক্তি কি?
Ø [5] অর্থাৎ, উপরোক্ত ভ্রষ্টতার মত যাকে চান তিনি
ভ্রষ্ট করেন এবং যাকে চান সুপথ প্রদর্শন করেন। এর মধ্যে পরিপূর্ণ যে হিকমত ও
যুক্তি বিদ্যমান রয়েছে, তা কেবলমাত্র আল্লাহই জানেন।
Ø [6] অর্থাৎ, এই কাফের এবং মুশরিকরা মনে করে যে,
জাহান্নামে তো
১৯ জনই ফিরিশতা আছেন এবং তাঁদেরকে কাবু করা কোন্ এমন কঠিন ব্যাপার?
কিন্তু তারা
জানে না যে, প্রতিপালকের সৈন্য সংখ্যা এত বেশী যা তিনি ছাড়া অন্য কেউ
জানে না। ফিরিশতার সংখ্যা এত যে, ৭০ হাজার ফিরিশতা প্রতিদিন আল্লাহর
ইবাদতের জন্য ‘বাইতুল মা’মূর’এ প্রবেশ করেন। অতঃপর কিয়ামত পর্যন্ত
এঁদের আর দ্বিতীয়বার প্রবেশের সুযোগ আসবে না। (বুখারী-মুসলিম)
Ø [7] অর্থাৎ, এই জাহান্নাম এবং তাতে নিযুক্ত ফিরিশতা
মানুষের জন্য নসীহতস্বরূপ। হতে পারে তারা আল্লাহর অবাধ্যতা হতে ফিরে আসবে। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
کَلَّا وَ الۡقَمَرِ ﴿ۙ۳۲﴾
(৩২) কখনই না।[1] চন্দ্রের শপথ।
Ø [1] كَلاَّ শব্দ
দিয়ে এখানে মক্কাবাসীদের ধারণার খন্ডন করা হয়েছে। অর্থাৎ,
তাদের ধারণা যে,
তারা ফিরিশতাদেরকে
পরাজিত করতে সক্ষম হবে। কখনই নয়, শপথ চাঁদ ও অবসানমুখী রাতের! [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
وَ الَّیۡلِ اِذۡ اَدۡبَرَ ﴿ۙ۳۳﴾
(৩৩) শপথ রাত্রির, যখন ওর অবসান ঘটে।
وَ الصُّبۡحِ اِذَاۤ اَسۡفَرَ ﴿ۙ۳۴﴾
(৩৪) শপথ
প্রভাতকালের,
যখন ওটা আলোকোজ্জ্বল হয়।
اِنَّهَا لَاِحۡدَی الۡکُبَرِ ﴿ۙ۳۵﴾
(৩৫) এই (জাহান্নাম)
বিশাল (ভয়াবহ বস্তু)সমূহের একটি। [1]
Ø [1] এটা কসমের জওয়াব। كُبَرٌ
হল كُبْرَى এর
বহুবচন। তিনটি অতি গুরুত্বপূর্ণ জিনিসের কসম খাওয়ার পর আল্লাহ তাআলা জাহান্নামের
বিশালতা ও তার ভয়াবহতার কথা বর্ণনা করছেন। যার পরে তার বিশালতা ও ভয়াবহতার
ব্যাপারে আর কোন সন্দেহ অবশিষ্ট থাকে না। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
نَذِیۡرًا لِّلۡبَشَرِ ﴿ۙ۳۶﴾
(৩৬) মানুষের জন্য
সতর্ককারী। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, এই জাহান্নাম সতর্ককারী। অথবা এই
সতর্ককারী হলেন নবী (সাঃ) অথবা কুরআন মাজীদ। কেননা,
কুরআন মাজীদও
তার বর্ণিত অঙ্গীকার ও ধমকের মাধ্যমে মানুষের জন্য সতর্ককারী ও ভীতিপ্রদর্শনকারী। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
لِمَنۡ شَآءَ مِنۡکُمۡ اَنۡ یَّتَقَدَّمَ اَوۡ یَتَاَخَّرَ ﴿ؕ۳۷﴾
৩৭. তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর
হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়তে চায় তার জন্য।(১)
Ø (১) এখানে অগ্ৰে যাওয়ার অর্থ ঈমান ও আনুগত্যের দিকে অগ্রণী
হওয়া। আর পশ্চাতে থাকার অর্থ ঈমান ও আনুগত্য থেকে পশ্চাতে থাকা। উদ্দেশ্য এই যে,
জাহান্নামের
শাস্তি থেকে সতর্ক করা সব মানুষের জন্যে ব্যাপক। অতঃপর এই সতর্কবাণী শুনে কেউ ঈমান
ও আনুগত্যের প্রতি অগ্রণী হয় এবং কোন কোন হতভাগা এরপরও পশ্চাতে থেকে যায়। [সা’দী, তাফসীরে জাকারিয়া]
کُلُّ نَفۡسٍۭ بِمَا کَسَبَتۡ رَهِیۡنَۃٌ ﴿ۙ۳۸﴾
(৩৮) প্রত্যেক
ব্যক্তি নিজ কৃতকর্মের দায়ে আবদ্ধ। [1]
Ø [1] رَهِين বন্ধক
রাখা জিনিসকে বলা হয়। অর্থাৎ, প্রতিটি মানুষ তার আমলের বিনিময়ে আটক,
বন্ধক ও দায়বদ্ধ
থাকবে। এই আমলই তাকে আযাব থেকে পরিত্রাণ দেবে;
যদি তা সৎ হয়।
অথবা তাকে ধ্বংস করে ফেলবে; যদি তা অসৎ হয়। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
اِلَّاۤ اَصۡحٰبَ الۡیَمِیۡنِ ﴿ؕۛ۳۹﴾
(৩৯) তবে ডান
হাত-ওয়ালারা নয়। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, তারা নিজেদের পাপের শিকলে বন্দী হবে না,
বরং তারা
নিজেদের নেক আমলের কারণে মুক্ত থাকবে। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
فِیۡ جَنّٰتٍ ۟ؕۛ یَتَسَآءَلُوۡنَ ﴿ۙ۴۰﴾
(৪০) তারা থাকবে
জান্নাতে এবং তারা জিজ্ঞাসাবাদ করবে-
عَنِ
الۡمُجۡرِمِیۡنَ ﴿ۙ۴۱﴾
(৪১) অপরাধীদের
সম্পর্কে,
[1]
Ø [1] فِي
جَنَّاتٍ হল أَصْحَابُ الْيَمِيْنِ থেকে হাল (ডানহাত-ওয়ালাদের অবস্থা ব্যাখ্যাকারী)। অর্থাৎ,
জান্নাতবাসীরা
বালাখানায় বসে জাহান্নামীদেরকে প্রশ্ন করবে। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
مَا سَلَکَکُمۡ فِیۡ سَقَرَ ﴿۴۲﴾
(৪২) ‘তোমাদেরকে কিসে
সাক্বার (জাহান্নাম)এ নিক্ষেপ করেছে?’
قَالُوۡا لَمۡ نَکُ مِنَ الۡمُصَلِّیۡنَ ﴿ۙ۴۳﴾
৪৩. তারা বলবে, আমরা সালাত
আদায়কারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না(১),
Ø (১) এর অর্থ হলো, যেসব মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান এনে সালাত
ঠিকমত আদায় করেছে আমরা তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না। [কুরতুবী,তাফসীরে জাকারিয়া]
وَ لَمۡ
نَکُ نُطۡعِمُ الۡمِسۡکِیۡنَ ﴿ۙ۴۴﴾
৪৪. আর আমরা অভাবগ্রস্থকে
খাদ্য দান করতাম না(১),
Ø (১) এ থেকে জানা যায় কোন অভাবী মানুষকে সামর্থ থাকা সত্বেও
খাবার না দেয়া বা সাহায্য না করা মানুষের দোযখ যাওয়ার কারণসমূহের মধ্যে একটা
কারণ। [দেখুন: ফাতহুল কাদীর, কুরতুবী]
وَ کُنَّا نَخُوۡضُ مَعَ الۡخَآئِضِیۡنَ ﴿ۙ۴۵﴾
(৪৫) এবং আমরা
সমালোচনা
কারীদের সাথে সমালোচনায়
নিমগ্ন থাকতাম। [1]
Ø [1] অর্থাৎ, অসার তর্ক-বিতর্কে এবং ভ্রষ্টতার সমর্থনে
কথাবার্তায় বড়ই উদ্যমের সাথে অংশ নিতাম। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
وَ کُنَّا نُکَذِّبُ بِیَوۡمِ الدِّیۡنِ ﴿ۙ۴۶﴾
(৪৬) আমরা কর্মফল
দিবসকে মিথ্যা মনে করতাম।
حَتّٰۤی اَتٰىنَا الۡیَقِیۡنُ ﴿ؕ۴۷﴾
(৪৭) পরিশেষে আমাদের
নিকট মৃত্যু আগমন করল।’ [1]
Ø [1] يَقِيْن অর্থ
মৃত্যু। যেমন, দ্বিতীয় স্থানে আল্লাহ তাআলা বলেন, {وَاعْبُدْ رَبَّكَ حَتَّى يَأْتِيَكَ
الْيَقِينُ} অর্থাৎ, তোমার মৃত্যু উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত তুমি তোমার প্রতিপালকের
ইবাদত কর। (সূরা হিজরঃ ৯৯)
فَمَا تَنۡفَعُهُمۡ شَفَاعَۃُ الشّٰفِعِیۡنَ ﴿ؕ۴۸﴾
৪৮. ফলে সুপারিশকারীদের
সুপারিশ তাদের কোন উপকার করবে না।(১)
Ø (১) এখানে هُم
সর্বনাম দ্বারা সেসব অপরাধীকে বোঝানো হয়েছে, পূর্বের আয়াতে যারা তাদের চারটি অপরাধ
স্বীকার করেছে-
Ø (১) তারা সালাত
আদায় করত না,
Ø (২) তারা কোন অভাবগ্ৰস্ত ফকীরকে আহার্য দিত না;
অর্থাৎ
দরিদ্রদের প্রয়োজনে ব্যয় করত না,
Ø (৩) ভ্ৰান্ত লোকেরা ইসলাম ও ঈমানের বিরুদ্ধে যেসব কথাবার্তা
বলত অথবা গোনাহ ও অশ্লীল কাজে লিপ্ত হত, তারাও তাদের সাথে তাতে লিপ্ত হত এবং
সম্পর্কহীনতা প্রকাশ করত না,
Ø (৪) তারা কেয়ামত অস্বীকার করত। এর দ্বারা প্রমাণিত হল যে,
যেসব অপরাধী এসব
গোনাহ করে এবং কেয়ামত অস্বীকার করার মত কুফরী করে,
তাদের জন্যে
কারও সুপারিশ উপকারী হবে না। কেননা, তারা কাফের। কাফেরদের জন্যে সুপারিশ করার
অনুমতি কাউকে দেয়া হবে না। কেউ করলে গ্রহনীয় হবে না। [দেখুন: ইবন কাসীর;
বাগভী;
বাদা’ইউত তাফসীর]
Ø কুরআনের
অন্যান্য আয়াত ও অনেক সহীহ হাদীসে প্রমাণিত আছে যে,
নবীরাসূলগণ,
শহীদগণ এবং সৎকর্মপরায়ণগণ-এমন
কি সাধারণ মুমিনগণও আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুমতি প্ৰাপ্তির পর অন্যান্য মুমিনদের
জন্যে সুপারিশ করবেন এবং তা কবুলও হবে। তবে কাফের মুশরিকদের কারও জন্য কোন সুপারিশ
কাজে আসবে না। [তাফসীরে জাকারিয়া]
فَمَا لَهُمۡ عَنِ التَّذۡکِرَۃِ مُعۡرِضِیۡنَ ﴿ۙ۴۹﴾
(৪৯) তাদের কী হয়েছে
যে, তারা উপদেশ (কুরআন) হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়?
کَاَنَّهُمۡ حُمُرٌ مُّسۡتَنۡفِرَۃٌ ﴿ۙ۵۰﴾
(৫০) তারা যেন
ভীত-সন্ত্রস্ত গর্দভ
فَرَّتۡ مِنۡ قَسۡوَرَۃٍ ﴿ؕ۵۱﴾
৫১. যারা সিংহের ভয়ে পলায়ন
করেছে।(১)
Ø (১) (حُمُرٌ
مُسْتَنْفِرَةٌ) অর্থ বন্য গাধা। আর قَسْوَرَة এর অর্থ সিংহ বা
তীরন্দাজ শিকারী। এ স্থলে উভয় অর্থ বর্ণিত আছে। [ফাতহুল কাদীর]
بَلۡ یُرِیۡدُ کُلُّ امۡرِیًٴ مِّنۡهُمۡ اَنۡ یُّؤۡتٰی صُحُفًا
مُّنَشَّرَۃً ﴿ۙ۵۲﴾
৫২. বরং তাদের মধ্যকার
প্রত্যেকেই কামনা করে যে, তাকে একটি উন্মুক্ত গ্ৰন্থ
দেয়া হোক।(১)
Ø (১) অর্থাৎ তারা চায় যে,
আল্লাহ তা'আলা যদি সত্যি সত্যিই মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নবী হিসেবে পাঠিয়ে থাকেন তাহলে তিনি মক্কার
প্রত্যেক নেতা ও সমাজপতিদের কাছে যেন একখানা করে পত্র লিখে পাঠান যে,
মুহাম্মদ
সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সত্যিই আমার নবী,
তোমরা তাঁর
আনুগত্য করো। [ফাতহুল কাদীর] কুরআন মজীদের অন্য এক জায়গায় মক্কার কাফেরদের এ
উক্তিরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, “আল্লাহর রাসূলদের যা দেয়া হয়েছে যতক্ষণ
পর্যন্ত তা আমাদের দেয়া না হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা মেনে নেব না।”
[সূরা আল-আন’আম: ২৪]
Ø অন্য এক
জায়গায় তাদের এ দাবীও উদ্ধৃত করা হয়েছে যে,
“আপনি আমাদের
চোখের সামনে আসমানে উঠে যান এবং সেখান থেকে লিখিত কিতাব নিয়ে আসেন,
আমরা তা পড়ে
দেখবো।” [সূরা আল-ইসরা: ৯৩]
کَلَّا ؕ بَلۡ لَّا یَخَافُوۡنَ الۡاٰخِرَۃَ ﴿ؕ۵۳﴾
৫৩. কখনো নয়(১); বরং তারা আখেরাতকে
ভয় করে না।(২)
Ø (১) অর্থাৎ তাদের এ ধরনের কোন দাবী কক্ষনো পূরণ করা হবে না।
[কুরতুবী]
Ø (২) অর্থাৎ এদের ঈমান না আনার আসল কারণ এটা নয় যে,
তাদের এ দাবী
পূরণ করা হচ্ছে না বরং এর আসল কারণ হলো এরা আখেরাতের ব্যাপারে বেপরোয়া ও নির্ভীক।
[ফাতহুল কাদীর] এরা এ পৃথিবীকেই পরম পাওয়া মনে করে নিয়েছে। [কুরতুবী]
کَلَّاۤ اِنَّهٗ تَذۡکِرَۃٌ ﴿ۚ۵۴﴾
৫৪. নিশ্চয় এ কুরআন তো সকলের
জন্য উপদেশবাণী।(১)
Ø (১) এখানে تَذْكِرَةٌ
তথা ‘উপদেশ’ বলে কুরআন মজীদ বোঝানো হয়েছে। কেননা,
এর শাব্দিক অর্থ
স্মারক। [ইবন কাসীর]
فَمَنۡ شَآءَ ذَکَرَهٗ ﴿ؕ۵۵﴾
(৫৫) অতএব যার ইচ্ছা
সে উপদেশ গ্রহণ করবে।
وَ مَا یَذۡکُرُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّشَآءَ اللّٰهُ ؕ هُوَ اَهۡلُ
التَّقۡوٰی وَ اَهۡلُ الۡمَغۡفِرَۃِ ﴿۵۶﴾
(৫৬) আর আল্লাহর
ইচ্ছা ব্যতিরেকে কেউ উপদেশ গ্রহণ করবে না।[1] একমাত্র তিনিই ভয়ের
যোগ্য এবং তিনিই ক্ষমা করার অধিকারী। [2]
Ø [1] অর্থাৎ, এই কুরআন থেকে হিদায়াত এবং নসীহত সে-ই
গ্রহণ করতে সক্ষম হবে, যার জন্য আল্লাহ চাইবেন।
Ø وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللهُ رَبُّ
الْعَالَمِينَ (التكوير:২৯)
Ø [2] অর্থাৎ, সেই আল্লাহই এর উপযুক্ত যে,
তাঁকে ভয় করা
হোক। আর তিনিই মাফ করার এখতিয়ার রাখেন।
Ø কাজেই তিনি এই
অধিকার রাখেন যে, তাঁর আনুগত্য করা হোক এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকা
হোক। এতে মানুষ তাঁর ক্ষমা ও রহমত পাওয়ার অধিকারী সাব্যস্ত হবে। [তাফসীরে আহসানুল বায়ান]
.jpeg)