সূরা মূলকের তাফসীর-১/Sura Mulk er Tafsir
পর্ব-১
# এই সূরাকে হাদিসে ‘মানিআ’ বা প্রতিরোধকারী নামকরণ করা
হয়েছে। [মুস্তাদরাকে হাকিম: ২/৪৯৮, আবুস শাইখ: তাবাকাতুল
ইসফাহানীয়্যিন: ২৬৪]
# অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা'আলার কিতাবে একটি সূরা আছে, যার আয়াত তো মাত্র তিরিশটি কিন্তু কেয়ামতের দিন এই সূরা
এক এক ব্যক্তির পক্ষে সুপারিশ করবে এবং তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করে জান্নাতে
দাখিল করবে; সেটা সূরা মুলক। [আবু দাউদ; ১৪:০০, তিরমিযী: ২৮৯১, নাসায়ী: আল কুবরা,
৭১০, ইবনে মাজহঃ ৩৭৮৬, মুসনাদে আহমাদ: ২/২৯৯, ৩২১]
# অন্য হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ‘আলিফ লাম তানযীল’ (সূরা আস-সাজদাহ) এবং ‘তাবারাকাল্লাযী বি ইয়াদিহিল মুলক’ (সূরা আল-মুলক) সূরাদ্বয় না পড়ে ঘুমাতেন না”। [তিরমিযী: ২৮৯৭, দারেমী: ৩৪১১, মুস্তাদরাকে হাকিমঃ ২/৪৪৬, (৩৫৪৫)]
بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
تَبٰرَکَ الَّذِیۡ بِیَدِهِ الۡمُلۡکُ ۫ وَ هُوَ عَلٰی کُلِّ
شَیۡءٍ قَدِیۡرُۨ ۙ﴿۱﴾
১.
বরকতময় তিনি,
সর্বময় কর্তৃত্ব(১) যাঁর হাতে; আর
তিনি
সবকিছুর উপর ক্ষমতাবান।
(১) এখানে রাজত্ব বলে আকাশ ও পৃথিবী এবং দুনিয়া ও আখেরাতের সার্বিক কর্তৃত্ব
বোঝানো হয়েছে। [কুরতুবী]
الَّذِیۡ
خَلَقَ الۡمَوۡتَ وَ الۡحَیٰوۃَ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَ
هُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡغَفُوۡرُ ۙ﴿۲﴾
২. যিনি সৃষ্টি করেছেন মৃত্যু ও জীবন, তোমাদেরকে পরীক্ষা করার জন্য—কে তোমাদের মধ্যে আমলের দিক থেকে উত্তম? তিনি পর্যক্রমশালী,
ক্ষমাশীল।
الَّذِیۡ
خَلَقَ سَبۡعَ سَمٰوٰتٍ طِبَاقًا ؕ مَا تَرٰی فِیۡ خَلۡقِ الرَّحۡمٰنِ مِنۡ
تَفٰوُتٍ ؕ فَارۡجِعِ الۡبَصَرَ ۙ هَلۡ تَرٰی مِنۡ فُطُوۡرٍ ﴿۳﴾
৩.
যিনি সৃষ্টি করেছেন স্তরে স্তরে সাত আসমান। রহমানের সৃষ্টিতে আপনি কোন খুঁত দেখতে
পাবেন না; আপনি
আবার তাকিয়ে দেখুন,
কোন ত্রুটি দেখতে পান কি?(১)
(১) মূল ব্যবহৃত শব্দটি হলো فطور যার অর্থ ফাটল, ছিদ্র, ছেড়া, ভাঙা-চোরা। [কুরতুবী]
ثُمَّ ارۡجِعِ الۡبَصَرَ کَرَّتَیۡنِ یَنۡقَلِبۡ اِلَیۡکَ الۡبَصَرُ
خَاسِئًا وَّ هُوَ حَسِیۡرٌ ﴿۴﴾
৪.
তারপর আপনি দ্বিতীয়বার দৃষ্টি ফেরান, সে দৃষ্টি
ব্যর্থ
ও ক্লান্ত হয়ে আপনার দিকে ফিরে আসবে।
وَ لَقَدۡ زَیَّنَّا السَّمَآءَ الدُّنۡیَا بِمَصَابِیۡحَ وَ
جَعَلۡنٰهَا رُجُوۡمًا لِّلشَّیٰطِیۡنِ وَ اَعۡتَدۡنَا لَهُمۡ عَذَابَ السَّعِیۡرِ
﴿۵﴾
৫.
আর অবশ্যই আমরা নিকটবর্তী আসমানকে সুশোভিত করেছি প্ৰদীপমালা দ্বারা(১) এবং
সেগুলোকে করেছি শায়তানের প্রতি নিক্ষেপের উপকরণ এবং তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি
জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি।
(১) مَصَابِيح শব্দের অর্থ
প্রদীপমালা। এখানে নক্ষত্ররাজি বোঝানো হয়েছে। [বাগভী; ফাতহুল কাদীর]
وَ لِلَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّهِمۡ عَذَابُ
جَهَنَّمَ ؕ وَ بِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ ﴿۶﴾
৬. আর যারা তাদের রবকে অস্বীকার করে তাদের
জন্য রয়েছে জাহান্নামের শাস্তি; এবং তা কত মন্দ ফিরে
যাওয়ার স্থান!
اِذَاۤ اُلۡقُوۡا فِیۡهَا سَمِعُوۡا لَهَا شَهِیۡقًا وَّ هِیَ
تَفُوۡرُ ۙ﴿۷﴾
৭. যখন তাদেরকে
সেখানে নিক্ষেপ করা হবে তখন
তারা
জাহান্নামের বিকট শব্দ শুনবে(১), আর তা হবে উদ্বেলিত।
(১) মূল ইবারতে شَهِيق শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যা গাধার ডাকের মত আওয়াজ বুঝানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। এ বাক্যের অর্থ এও হতে
পারে যে, এটা খোদ জাহান্নামের
শব্দ। [ফাতহুল কাদীর, কুরতুবী] যেমন পবিত্র
কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, “জাহান্নামের দিকে যাওয়ার পথে এসব লোক দূরে থেকেই তার ক্রোধ ও প্রচণ্ড
উত্তেজনার শব্দ শুনতে পাবে।” [সূরা আল-ফুরকান: ১২] আবার এও হতে পারে যে, জাহান্নাম থেকে এ শব্দ আসতে থাকবে, ইতিমধ্যেই যেসব লোককে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছে তারা জোরে জোরে চিৎকার
করতে থাকবে। যেমন অন্যত্র বলা হয়েছে, এ জাহান্নামীরা জাহান্নামের মধ্যে হাঁপাতে, গোঙ্গাতে এবং হাসফাস করতে থাকবে।” [সূরা হূদ; ১০৬]
کَادُ تَمَیَّزُ مِنَ الۡغَیۡظِ ؕ کُلَّمَاۤ اُلۡقِیَ فِیۡهَا
فَوۡجٌ سَاَلَهُمۡ خَزَنَتُهَاۤ اَلَمۡ یَاۡتِکُمۡ نَذِیۡرٌ ﴿۸﴾
৮. রোষে জাহান্নাম যেন ফেটে পড়বে, যখনই তাতে
কোন দলকে নিক্ষেপ করা হবে, তাদেরকে রক্ষীরা জিজ্ঞেস করবে, তোমাদের কাছে কি কোন সতর্ককারী আসেনি?
قَالُوۡا بَلٰی قَدۡ جَآءَنَا نَذِیۡرٌ ۬ۙ فَکَذَّبۡنَا وَ
قُلۡنَا مَا نَزَّلَ اللّٰهُ مِنۡ شَیۡءٍ ۚۖ اِنۡ اَنۡتُمۡ اِلَّا فِیۡ ضَلٰلٍ
کَبِیۡرٍ ﴿۹﴾
৯. তারা বলবে, হ্যাঁ, অবশ্যই আমাদের কাছে
সতর্ককারী এসেছিল, তখন আমরা মিথ্যারোপ
করেছিলাম এবং বলেছিলাম, আল্লাহ কিছুই নাযিল করেননি, তোমরা তো মহাবিভ্রান্তিতে রয়েছ।
وَ قَالُوۡا لَوۡ کُنَّا نَسۡمَعُ اَوۡ نَعۡقِلُ مَا
کُنَّا فِیۡۤ اَصۡحٰبِ السَّعِیۡرِ ﴿۱۰﴾
১০.
আর তারা বলবে,
যদি আমরা শুনতাম অথবা বিবেক-বুদ্ধি প্রয়োগ করতাম, তাহলে আমরা
জ্বলন্ত আগুনের অধিবাসী হতাম না।(১)
(১) অর্থাৎ আমরা যদি সত্যানুসন্ধিৎসু হয়ে নবীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতাম অথবা
নবীগণ আমাদের সামনে যা পেশ করেছেন তা আসলে কি বুদ্ধি-বিবেক খাটিয়ে তা বুঝার
চেষ্টা করতাম। হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “যতক্ষণ পর্যন্ত মানুষ তাদের অপরাধের ব্যাপারে নিজেদের উপর দোষ স্বীকার করবে
ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের ব্যাপারে চূড়ান্ত ফয়সালা করা হবে না।” [আবু দাউদ: ৪৩৪৭, মুসনাদে আহমাদ: ৫/২৯৩]
فَاعۡتَرَفُوۡا
بِذَنۡۢبِهِمۡ ۚ فَسُحۡقًا لِّاَصۡحٰبِ
السَّعِیۡرِ ﴿۱۱﴾
(১১) তারা তাদের অপরাধ স্বীকার করবে।[1]
সুতরাং জাহান্নামীরা
(আল্লাহর রহমত হতে) দূর হোক![2]
[1]
যার
কারণে শাস্তির যোগ্য বিবেচিত হয়েছে;
আর
তা হল, কুফরী করা এবং নবীদেরকে
মিথ্যা ভাবা।
[2]
অর্থাৎ, তারা এখন আল্লাহ এবং তাঁর রহমত থেকে বহু দূরে সরে যাবে। কেউ
কেউ বলেন, سُحْقٌ ‘সুহ্ক্ব’ জাহান্নামের একটি উপত্যকার নাম।
তাফসীরে আহসানুল বায়ান
