সূরা আল-ক্বালাম-এর তাফসির-১
সূরা আল-ক্বালাম-এর তাফসির-১
মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ৬৮ নং সূরা হলো সূরা আল-ক্বালাম। এর আয়াত সংখ্যা ৫২। সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ । আজ আমরা পর্বে সূরা ক্বালামের ১ম আয়াত থেকে ৯ম আয়াত পর্যন্ত আলোচনা করব ইনশা-আল্লাহ্। আলোচ্য আয়াতসমূহে আল্লাহ তাবারাক ওয়া তাআলা সর্ব কালের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাদের প্রিয় নাবী মুহাম্মদ (স)-এর মর্যাদা প্রসঙ্গে আলোকপাত করেছেন। সুতরাং আজকের আলোচ্য বিষয়-
মুহাম্মদ (স)-এর মর্যাদা
ن ۚ وَالْقَلَمِ وَمَا يَسْطُرُونَ (1)
নূন, কলমের কসম (১) এবং লেখকগণ যা লেখেন তার কসম,
আপনার প্রতিপালকের অনুগ্রহে আপনি পাগল নন।
আর নিশ্টয়ই আপনার জন্য এমন প্রতিদান রয়েছে, যারা ধারাবাহিকতা কোনদিন নিঃশেষ হবে না।
নিশ্চয়ই আপনি নৈতিকতার অতি উচ্চ মর্যাদায় অভিষিক্ত।(২)
অচিরেই আপনিও দেখতে পাবেন, তারাও দেখতে পাবে।
তোমাদের মধ্যে আসলে কে পাগল?
যে সব লোক সঠিক পথ হারিয়েছে, আপনার প্রতিপালক তাদেরকে ভালভাবেই জানেন। আর যে সব লোক সঠিক পথে রয়েছে, তাদেরকে আপনার প্রতিপালক খুব ভালভাবেই চেনেন।
কাজেই আপনি অস্বীকারকারীদের অনুগত হবেন না।
এ লোকেরা আপনার শিথিলতা কামনা করে। তাহলে তারাও শিথিলতা করবে।
----------------------------
- উবাদা ইবনু ছামেত (রা) বলেন, নবী (স) বলেছেন, ‘আল্লাহ প্রথম যে বস্তু সৃষ্টি করেছেন, তা হচ্ছে কলম। অতঃপর আল্লাহ কলমকে বললেন, লেখ। কলম বলল, কি লিখব? আল্লাহ বললেন, তাকদীর লেখ। সুতরাং কলম যা কিছু ছিল এবং অনন্তকাল পর্যন্ত হবে সবকিছুই লিখল।’ (তিরমিযী, মিশকাত হা/৯৪)
অত্র হাদীস প্রমাণ করে যে, আল্লাহ সর্বপ্রথম কলম সৃষ্টি করেন। আর এ সূরায় আল্লাহ তা‘আলা কলমের কসম করেছেন।
2. আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূল (স) বলেছেন, ‘তোমরা কি জান কোন জিনিস মানুষকে সবচাইতে
বেশী জান্নাতে প্রবেশ করায়? তা হল আল্লাহভীতি ও উত্তম চরিত্র। তোমরা কি জান মানুষকে কোন জিনিস সবচাইতে বেশী জাহান্নামী প্রবেশ করায়? তাহল দুটি ছিদ্র পথ। একটি মুখ এবং অপরটি লজ্জাস্থান’ (তিরমিযী, ইবনু মাজাহ, মিশকাত হা/৪৮৩২)
অত্র হাদীস দ্বারা জানা যায়, উত্তম চরিত্রের বিনিময় হচ্ছে জান্নাত।
ওকবা ইবনু আমের (রা) বলেন, আমি রাসূল (স)-এর সাথে সাক্ষাত করলাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল (স) বাঁচার পথ কি? তিনি বললেন, ‘তুমি তোমার মুখ সংযত রাখ, তুমি তোমার বাড়ীতে নিরালায় থাকো এবং তুমি তোমার পাপের জন্য কান্নাকাটি কর ও লজ্জিত হও।’ (আহমাদ, তিরমিযী, মিশকাত হা/৪৮৩৭)
উবাদা ইবনু ছামেত (রা) হতে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য ছয়টি বিষয়ের যিম্মাদারী গ্রহণ কর, তাহলে আমি তোমাদেরকে জান্নাতে নিয়ে যাওয়ার জন্য যামিন হব। (১) তোমরা কথা বললে সত্য বলবে, (২) ওয়াদা করলে পূর্ণ করবে। (৩) তোমাদের নিকট আমানত রাখা হলে তা সময় মত আদায় করবে, (৪) নিজেদের লজ্জাস্থানকে হেফাযতে রাখবে, (৫) দৃষ্টিকে নীচে রাখবে (৬) নিজের হাতকে অন্যায় কাজ হতে বিরত রাখবে।’ (আহমাদ, শু’আবুল ঈমান, মিশকাত হা/৪৮৭০)
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (স) বলেছেন, রেহম বা সদাচরণ শব্দটি রহমান হতে নির্গত। এ কারণে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, হে সদাচরণ! তোমাকে যে ব্যক্তি গ্রহণ করবে, আমি আল্লাহ তাকে গ্রহণ করব। আর যে ব্যক্তি তোমাকে ত্যাগ করবে, আমি তাকে ত্যাগ করব।’ (বুখারী, মিশকাত হা/৪৯২০)
ছাওবান (রা) বলেন, রাসূল (স) বলেছেন, ‘রাসূল (স) বলেছেন, ‘সকল মুমিন এক ব্যক্তির মত, যদি তার চক্ষু অসুস্থ হয়, তখন সমস্ত শরীরে ব্যথা অনুভব করে এবং মাথায় ব্যথা হলে সমস্ত শরীরে ব্যথা অনুভব করে।’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৪)
আব্দুল্লাহ ইবনু ্ ওমর (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (স) বলেছেন, ‘এক মুসলমান অপর মুসলমানের ভাই, সে তার উপর যুলুম করবে না এবং তাকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিবেন না। যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দু:খ -কষ্ট দূর করবেন, ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ তার বিপদ দূর করবেন। আর যে ব্যক্তি কোন মুসলমানের দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবে, আল্লাহ তার দোষ-ত্রুটি ঢেকে রাখবেন।’ (বুখারী,মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৫৮)
আনাস (রা) হতে বর্ণিত রাসূল (স) বলেছেন, ‘সেই মহান সত্তার কসম! যার হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, কোন ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার হবে না, যে পর্যন্ত সে নিজের ভাইয়ের জন্য তা পছন্দ না করবে, যা সে নিজের পছন্দ করে।’ (বৃখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬১)
আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূল (স) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম, সে ঈমানদার নয়, আল্লাহর কসম! সে ঈমানদার নয়। জিজ্ঞেস করা হল হে আল্লাহর রাসূল! সে কে? তিনি বললেন, যার প্রতিবেশী তার অন্যায় হতে নিরাপদ থাকে না।’ (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬২)
আয়েশা (রা) বলেন, রাসূল (স) বলেছেন, ‘জিবরাঈল সর্বদা আমাকে প্রতিবেশী সম্পর্কে উপদেশ দিতে থাকেন। এমনকি আমার এ ধারণা হচ্ছিল যে, অচিরেই তিনি প্রতিবেশীকে অংশীদার করে দিবেন।’ (বুখা রী, মুসলিম, মিশকাত হা/৪৯৬৪)
আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা) বলেন, আমি রাসূল (স) কে বলতে শুনেছি, ঐ ব্যক্তি পূর্ণ ঈমানদার নয়, যে তৃপ্তি সহকারে খায় আর তার প্রতিবেশী অনাহারে থাকে।’ (শু‘আবুল ঈমান, মিশকাত হা/ ৪৯৯১)
আবু হুরায়রা (রা) বলেন, একদা জনৈক ব্যক্তি বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স) অমুক মহিলা নফল ছালাত আদায় করা, ছিয়াম পালন করা এবং দান করার ব্যাপারে অধিক প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। তবে সে নিজের মুখের দ্বারা প্রতিবেশীদের কষ্ট দেয়। তিনি বললেন, সে জাহান্নামী। লোকটি আবার বলল, হে আল্লাহর রাসূল (স)! অমুক মহিলা যার সম্পর্কে বলা হয় যে, সে কম ছিয়াম পালন করে, কম দান করে, কম সালাত আদায় করে, এমনকি তার দানের পরিমাণ হল পনীরের টুকরা। তবে সে নিজের মুখ দ্বারা প্রতিবেশীকে কষ্ট দেয় না। নবী করীম (স) বললেন, সে জান্নাতী।’ (আহমাদ, মিশকাত হা/৪৯৯২)
আবু হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূল (স) বলেছেন, ‘আল্লাহ যখন কোন ব্যক্তিকে ভালোবাসেন, তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক ব্যক্তিকে ভালবাসি, সুতরাং তুমিও তাকে ভালোবাস। অতঃপর জিবরাঈল (আ) তাকে ভালোবাসতে থাকেন। তারপর আকাশবাসীকে বলে দেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ভালবাসেন। অতএব তোমরা তাকে ভালোবাস। তখন আকাশের সকল ফেরেশতা তাকে ভালবাসতে থাকেন। অতঃপর সে ব্যক্তির জন্য যমীনেও জনপ্রিয়তা দান করেন। আল্লাহ যখন কোন ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন, তখন জিবরীলকে ডেকে বলেন, আমি অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করি, সুতরাং তুমিও তাকে ঘৃণা কর। অতঃপর জিবরাঈল (আ) তাকে ঘৃণা করতে থাকেন। তারপর আকাশবাসীকে বলে দেন যে, আল্লাহ অমুক ব্যক্তিকে ঘৃণা করেন। অতএব তোমরা তাকে ঘৃণা কর। তখন আকাশের সকল ফেরেশতা তাকে ঘৃণা করতে থাকেন। অতঃপর সে ব্যক্তির জন্য যমীনেও মানুষের মনে ঘৃণা সৃষ্টি করা হয়।’ (মুসলিম, মিশকাত হা/ ৫০০৫)
আবূ হুরায়রা (রা) বলেন, রাসূল (স) বলেছেন,‘কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, যারা আমার মর্যদার খাতিরে পরস্পরে ভালবাসা স্থাপন করেছে, তারা কোথায়? আজ আমি তাদেরকে আমার বিশেষ মন। আজ এমন দিন, আমার ছায়া ব্যতীত আর কোন ছায়া নেই।’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫০০৬)
আবূ হুরায়রা (রা) আরো বলেন, রাসূল (স) বলেছেন, ‘এক ব্যক্তি অন্য এক গ্রামে তার মুসলমান ভাইয়ের সাথে সাক্ষাতের জন্য বের হল। আল্লাহ তার গমন পথে ফেরেশতা বসিয়ে রাখলেন। লোকটি সেখানে পৌঁছলে ফেরেশতা জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথাও যাও। সে বলল, ঐ গ্রামে আমার একজন দ্বীনী ভাই আছে, তাকে দেখতে যাচ্ছি। তখন ফেরেশতা বললেন, তুমি তার উপর কোন অনুগ্রহ করেছ, যার বিনিময় লাভের জন্য যাচ্ছ? লোকটি বলল, আমি তাকে একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ভালবাসি, তািই তাকে দেখতে যাচ্ছি। তখন ফেরেশতা বলেন, আমি আল্লাহর পক্ষ হতে তোমার নিকট এ সংবাদ দেয়ার জন্য এসেছি যে, আল্লাহ তোমাকে অনুরূপ ভালবাসেন, যেমন তুমি তাকে ভালবাস।’ (মুসলিম, মিশকাত হা/৫০০৭)