ইসলামে নারীর অধিকার - ইসলামে নারীর সম্পত্তির অধিকার - Women's Rights in Islam
বিশ্বের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের পূর্বে নারীর অধিকারের বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা ছিল না। সভ্যতার দাবিদার ইহূদী-খৃস্টান ধর্মের ধর্মগ্রন্থ বাইবেলে আমরা দেখি যে, পিতা, সন্তান বা স্বামীর সম্পত্তিতে নারীর কোনো অধিকার দেওয়া হয় নি, কেবলমাত্র পিতার যদি কোন পুত্র সন্তান না থাকে তবে তার সম্পত্তি কন্যারা লাভ করবে। কিন্তু সেক্ষেত্রে এ সকল কন্যা পিতার বংশের বাইরে কাউকে বিবাহ করতে পারবে না, কারণ এতে এক বংশের সম্পত্তি অন্য বংশে চলে যাবে!!
শুধু তাই নয়, নারীর নিজের পক্ষ থেকে সম্পদ অর্জনেরও কোনো অধিকার ছিল না। ১০০ বৎসের আগেও ইহূদী ও খৃস্টান জগতের আইন ছিল যে বিবাহের সঙ্গে সঙ্গে স্ত্রীর সম্পত্তি স্বামীর মালিকানায় চলে যাবে এবং স্বামী নিজের ইচ্ছামত তা ব্যবহার বা বিক্রয় করতে পারবে। ঊনবিংশ শতক থেকে বিবাহিত নারীদের স্বতন্ত্রভাবে সম্পদ অর্জনের অধিকার দিয়ে আইন তৈরি করা হয় ১৮৪৮ খৃস্টাব্দে নিউ ইয়র্ক স্টেটে The married women’s Property Act পাশ করা হয়, যাতে সর্বপ্রথম স্বীকার করা হয় যে, নারীদেরও স্বতন্ত্র আইনগত সত্ত্বা বা পরিচয় আছে (This was the first law that clearly established the idea that a married woman had an independent legal identity.)। অনুরূপভাবে কর্মের ক্ষেত্রে, চাকুরীর ক্ষেত্রে, সম্পত্তি অর্জনের ক্ষেত্রে, উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে, বিবাহ করা বা না করার ক্ষেত্রে, রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নেতৃত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে ও অন্যান্য সকল ক্ষেত্রে নারীদের বলতে গেলে কোনো অধিকারই ছিল না। কোনো কোনো ধর্মে তো স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর বেঁচে থাকার অধিকারও ছিল না। বরং স্বামীর সাথে চিতায় জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হয়ে আত্মাহূতি দেওয়াই ছিল তাদের নিয়তি।
বস্তুত গত ঊনবিংশ শতক থেকে নারীদের অধিকারের বিষয়ে জোরালো দাবিদাওয়া ও আন্দোলন শুরু হয় এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে বিভিন্ন রকমের আইনকানুন তৈরি হয়। (তথ্যসূত্র: খুতবাতুল ইসলাম, ড. আব্দুল্লাহ্ জাহাঙ্গীর (রঃ), পৃ-২২৩)
নারী ও পুরুষ উভয়েই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। নারী ও পুরুষের মধ্যে কিছু “বৈষম্য” বা “পার্থক্য” দিয়েই তিনি তাদেরকে সৃষ্টি করেছেন। আর এ “বৈষম্য” বা “পার্থক্য”-ই মানব সভ্যতার টিকে থাকার মূল ভিত্তি। নারী ও পুরুষের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মানুষ পৃথিবীতে আগমন করে। নবাগত শিশুদেরকে পরিপূর্ণ স্নেহ ও মমতা দিয়ে লালন করা এবং তার মধ্যে মানবীয় মূল্যবোধগুলি বিকশিত করা ভবিষ্যৎ মানব সভ্যতার প্রতি বর্তমান নারী ও পুুরুষের প্রধান দায়িত্ব। আর এ দায়িত্বের পরিপূর্ণ পালনের জন্য নারী ও পুরুষের মধ্যে প্রকৃতিগতভাবে কিছু বৈষম্য বা পার্থক্য তৈরি করা হয়েছে, যেগুলির বিলোপ সাধন করলে মানব সভ্যতা ধ্বংস হতে বাধ্য। ইসলামের মূলনীতি হলো, প্রাকৃতিক এ বৈষম্যকে পূঁজি করে যেন নারীদেরকে তাদের ন্যায়সঙ্গত অধিকার থেকে বঞ্চিত করা না হয় এবং বৈষম্য দূরীকরণ বা সমতা প্রতিষ্ঠার নামে প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনষ্ট করা না হয়। এজন্য ইসলামে নারী ও পুরুষের অধিকার প্রদানের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের মূল দায়িত্ব ও প্রাকৃতিক এ বৈষম্যের দিকে লক্ষ্য রাখা হয়েছে। ফলে নারী হিসেবে তাকে অধিকার বঞ্চিত করা হয় নি, বৈষম্য করা হয় নি বা অবহেলা করা হয় নি। পক্ষান্তরে সমান অধিকারের নামে তাকে পুরুষের মত সমান দায়িত্ব দিয়ে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট করা হয় নি।
আল্লাহ্ সুবহানাহু ইরশাদ করেনঃ
وَلَا تَتَمَنَّوۡاْ مَا فَضَّلَ ٱللَّهُ بِهِۦ بَعۡضَكُمۡ عَلَىٰ بَعۡضٖۚ لِّلرِّجَالِ نَصِيبٞ مِّمَّا ٱكۡتَسَبُواْۖ وَلِلنِّسَآءِ نَصِيبٞ مِّمَّا ٱكۡتَسَبۡنَۚ وَسَۡٔلُواْ ٱللَّهَ مِن فَضۡلِهِۦٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ بِكُلِّ شَيۡءٍ عَلِيمٗا-
“আল্লাহ্ যা দিয়ে তোমাদের কাউকে কারো উপরে শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন তোমরা তার লালসা করো না। পুরুষ যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ এবং নারী যা অর্জন করে তা তার প্রাপ্য অংশ। আর তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ প্রার্থনা কর। আল্লাহ্ সর্ব বিষয়ে সর্বজ্ঞ।” (সূরা নিসা : ৩২)
নারীর প্রথম অধিকারঃ ধর্মীয় অধিকার
ধর্মপালন মানুষের জন্মগত অধিকার। সকল মানুষেরই অধিকার আছে ধর্ম পালন, আল্লাহর স্মরণ, প্রার্থনা ইত্যাদির মাধ্যমে তার অশান্ত হৃদয় শান্ত করার ও আত্মিক প্রশান্তি, পরিতৃপ্তি ও আখিরাতের পুরুস্কার অর্জন করার। অনেক ধর্মে জাতি, বংশ, বর্ণ বা লিঙ্গের কারণে অনেক মানুষকে এ জন্মগত ধর্মীয় অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ ইহূদী ও খৃস্টান ধর্ম। প্রচলিত ‘বিকৃত’ বাইবেলের বক্তব্য অনুসারে হাওয়া প্রথম নিষিদ্ধ ফল ভক্ষণ করেন এবং আদমকে তা ভক্ষণ করতে প্ররোচিত করেন, এ কারণে ইহূদী ও খৃস্টান ধর্মে মানব জাতির পতনের জন্য নারীকে দায়ি করা হয়। বাইবেলের এ গল্পকে নারী ও পুরুষের মধ্যে ধর্মীয় ও অন্যান্য বৈষম্য প্রতিষ্ঠার মূল যুক্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বাইবেলের নতুন নিয়মে খৃস্টধর্মের বিধান নিম্নরূপ:
আমি উপদেশ দিবার কিম্বা পুরুষের উপরে কর্তৃৃত্ব করিবার অনুমতি নারীকে দিই না, কিন্তু মৌনভাবে থাকিতে বলি। কারণ প্রথমে আদমকে, পরে হবাকে (হাওয়াকে) নির্মাণ করা হইয়াছিল। আর আদম প্রবঞ্চিত হইলেন না, কিন্তু নারী প্রবঞ্চিতা হইয়া অপরাধে পতিত হইলেন। (বাইবেল, নতুন নিয়ম, তীমথিয় ২/১২-১৪)
কুরআনুল কারীমে কখনোই প্রচলিত বাইবেলের এ গল্প সমর্থন করা হয় নি বা এ জন্য হাওয়াকে দায়ি করা হয় নি। বরং সর্বদা আদম ও হাওয়াকে সমভাবে দায়ি করা হয়েছে। সর্বোপরি, এরূপ বিষয়কে নারী ও পুরুষের মধ্যে বৈষম্যের বাহন বানানো হয় নি। বরং সকল ধর্মীয় বিষয়ে নারী ও পুরুষকে সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। তবে সমান দায়িত্ব দেওয়া হয় নি। সালাত, সাওম, হাজ্জ, যাকাত ও সকল ক্ষেত্রেই নারীরা সমান অধিকার ভোগ করেন। তবে নারী প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে ‘দায়িত্ব’ কিছুটা হাল্কা করা হয়েছে। যেমন পুরুষের জন্য জামাতে সালাত আদায় করা জরুরী দায়িত্ব। কিন্তু নারীর জন্য তা জরুরী দায়িত্ব নয়, সুযোগ মাত্র। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেনঃ “তোমাদের নারীগণ মসজিদে যাওয়ার অনুমতি চাইলে তাদেরকে নিষেধ করবে না, তাদেরকে অনুমতি দিবে। (অন্য বর্ণনায়: তাদেরকে মাসজিদে গমনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত করবে না, আল্লাহর বান্দীদের মাসজিদে সালাত পড়তে নিষেধ করবে না) তবে তাদের বাড়িতে সালাত পড়াই তাদের জন্য উত্তম।” (সহীহ্ বুখারী ১/৩০৫,সহীহ্ মুসলিম ১/৩২৬)
নারীর মাতৃত্ব, দুগ্ধদান, পর্দা পালন ও অন্যান্য দায়িত্বের সাথে সঙ্গতি রেখেই তাদের জন্য এ বিধান দেওয়া হয়েছে। সকল প্রকার ইবাদতের ক্ষেত্রেই এভাবে নারীদেরকে সমান অধিকার ও সুযোগ দেওয়া হয়েছে, তবে দায়িত্বের ক্ষেত্রে অনেক রেয়াত দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় অধিকারঃ পারিবারিক ও সামাজিক অধিকার
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পূর্বে এবং তাঁর অনেক পরেও অনেক দেশে নারীর বেঁচে থাকার অধিকারই ছিল না। ইসলাম পূর্বে ও বর্তমানেও ভারতে, চীনে ও অন্যান্য দেশে জন্মের আগে বা পরে কন্যা শিশুকে হত্যা করা হয়। স্বামীর মৃত্যুর সাথে সাথে স্ত্রী বেঁচে থাকার অধিকার হারাত এবং স্বামীর চিতায় প্রাণ দিত। শিক্ষা, কর্ম, চাকরী, বিবাহ ইত্যাদি ক্ষেত্রে নারীকে অধিকার বঞ্চিত করা হয়েছে বা তার মতামতের কোনো মূল্য দেওয়া হয় নি। বাইবেলে নারীর শিক্ষার অধিকার সীমিত করা হয়েছে। তাদেরকে কেবলমাত্র স্বামীর নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে: “স্ত্রীলোকেরা মন্ডলীতে নীরব থাকুক, কথা কহিবার অনুমতি তাহাদিগকে দেওয়া যায় না, বরং যেমন ব্যবস্থাও (তাওরাত বা শরীয়ত) বলে, তাহারা বশীভূতা হইয়া থাকুক। আর যদি তাহারা কিছু শিখিতে চায়, তবে নিজ নিজ স্বামীকে ঘরে জিজ্ঞাসা করুক।” (বাইবেল, নতুন নিয়ম, ১ করিন্থীয় ১৪/৩৪-৩৫)
পক্ষান্তরে পানাহার, শিক্ষা, দীক্ষা, উপহার, আচরণ সকল ক্ষেত্রে পুত্র ও কন্যাদের সাথে সমান আচরণ ও সমান অধিকার নিশ্চিত করতে ইসলামে সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বিবাহ ও পরিবার গঠনে পুরুষ ও নারী উভয়ের পছন্দ ও মতামতকে সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। পারিবারিক জীবনে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে প্রাকৃতিক পার্থক্য ও দায়িত্বের ভারসম্য রক্ষা করে সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। পারিবারিক জীবনে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে প্রাকৃতিক পার্থক্য ও দায়িত্বের ভারসম্য রক্ষা করে সমান অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
তৃতীয় অধিকারঃ অর্থনৈতিক অধিকার
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আগমনের পূর্বে এবং তাঁর পরেও প্রায় ১২/১৩ শত বৎসর পর্যন্ত নারীরা প্রায় সকল প্রকার অর্থনৈতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পিতা, স্বামী, ভ্রাতা বা পুত্রের সম্পত্তিতে নারীর উত্তরাধিকার লাভের তেমন কোনো ব্যবস্থা ছিল না। নিজের পক্ষ থেকে কোনো সম্পদ উপার্জন করতে পারলেও বিবাহের সাথে সাথে স্ত্রীর সম্পত্তি স্বামীর মালিকানাধীন হয়ে যেত। ঊনবিংশ শতাব্দির মধ্যভাগ থেকে, অর্থাৎ প্রায় দেড় শত বৎসর যাবৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন ক্রমান্বয়ে আইনের মাধ্যমে নারীর পৃথক সম্পত্তির মালিকানা লাভ, স্বামীর অনুমতি ছাড়া স্বাধীনভাবে ব্যবসা, বাণিজ্য, চুক্তি ইত্যাদি সম্পাদনের অধিকার দেওয়া হচ্ছে।
পক্ষান্তরে ইসলামে প্রথম থেকেই অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। বিবাহিত ও অবিবাহিত সকল অবস্থায় একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষের মত একইভাবে ব্যবসা, বাণিজ্য, চুক্তি, সম্পদ অর্জন, সম্পদ ক্রয়বিক্রয় ইত্যাদি সকল ক্ষেত্রে সমান অধিকার সংরক্ষণ করেন। এক্ষেত্রে পিতা, স্বামী বা অন্য কারো কোনোরূপ মাতবর, তত্ত্বাবধান বা খবরদারির আইনগত অধিকার বা সুযোগ দেওয়া হয় নি।
অর্থনৈতিক অধিকারের একটি দিক উত্তরাধিকার, যা মূলত পরিবারের সাথে জড়িত। মানুষ পারিবারিকভাব যে অর্থনৈতিক অধিকার লাভ করে তার অন্যতম উত্তরাধিকার ব্যবস্থা। ইসলামের পূর্বে এবং ইসলামের পরেও ঊনবিংশ শতক পর্যন্ত হিন্দু ধর্ম, ইহূদী-খৃস্টান ধর্ম ও অন্যান্য ধর্ম ও সভ্যতায় পিতা বা স্বামীর সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার লাভ করেন নি। পক্ষান্তরে ইসালমে নারীর জন্য পুরুষের পাশাপাশি উত্তরাধিকার লাভের বিষয় সুনিশ্চিত করা হয়েছে। খৃস্টান বিশ্বে যেহেতু কোনো অধিকারই ছিল না, সেহেতু অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তারা স্বামী ও পিতার সম্পত্তিতে নারীর ‘সমান উত্তরাধিকার’ প্রতিষ্ঠার দাবি করছেন এবং অনেক দেশে এরূপ অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। পক্ষান্তরে ইসলামে উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সাধারণত নারীকে পুরুষের অর্ধেক উত্তরাধিকার প্রদান করা হয়েছে। ইসলামী সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে অজ্ঞতা বা ইসলাম বিদ্বেষের কারণে অনেকে এরূপ বিধানকে নারীর প্রতি বৈষম্য বলে দাবি বা প্রচার করেন। বস্তুত সমান অধিকারের নামে নারীকে পুরুষের সমান অধিকার ও দায়িত্ব প্রদান করেই নারীর প্রতি বৈষম্য করা হয়েছে। আর ইসলামে নারীকে উত্তরাধিকারে অর্থনৈতিক দায়িত্বে একেবারে দায়িত্বমুক্ত করে বিশেষ সুবিধা প্রদান করেছে।
আমরা জানি, আলকুরআনে বলা হয়েছে, পুত্র পাবে ২ ভাগ, কন্যা পাবে ১ ভাগ।-এই ঘোষণায় অনেকেই হৈচৈ করে বলে যে, ইসলাম নারীকে ঠকিয়েছে। আসলে ইসলামে পর্যাপ্ত নোলেজ না থাকলে যা হয়, এদের তাই হয়েছে। আসুন বিষয়টি বুঝার চেষ্টা করিঃ
মনে করুন একজন পিতা ১০ লক্ষ টাকার সম্পদ এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্য রেখে গেলেন। ইসলামী ব্যবস্থায় পুত্র সাড়ে ৬ লাখ টাকা ও কন্যা সাড়ে ৩ লাখ টাকার সম্পদ লাভ করবে। বিবাহের সময় পুত্র আনুমানিক এক লক্ষ টাকা মোহর তার স্ত্রীকে দিবে এবং কন্যা ১ লক্ষ টাকা তার স্বামী থেকে মহর হিসেবে লাভ করবে। ফলে পুত্রের সাড়ে ৫ লাখ ও কন্যার সাড়ে ৪ লাখ টাকার সম্পদ থাকবে। একটি ছোট্ট পরিবারের স্বাভাবিক ব্যয়ভার মাসিক ৫ হাজার টাকা হলে পুত্রকে তার সাড়ে ৫ লাখ টাকা থেকে প্রতি মাসে ৫ হাজার টাকা খরচ করতে হবে। পক্ষান্তরে কন্যাকে একটি পয়সাও খরচ করতে হবে না; কারণ ইসলামী ব্যবস্থায় স্ত্রী ও সন্তানদের যাবতীয় খরচ বহনের দায়িত্ব স্বামীর। কখনো বিধবা বা পরিত্যাক্তা হলে নারীকে শুধু তার নিজের ব্যয়ভার বহন করতে হবে, তার সন্তানদের খরচের দায়িত্ব স্বামীর পরিবার বা রাষ্ট্রের। এভাবে আমরা দেখছি যে, ইসলামে নারীকে পুরুষের প্রায় সমান অর্থনৈতিক অধিকার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু সকল অর্থনৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত রাখা হয়েছে। এভাবে পারিবারিক অর্থ ব্যবস্থায় নারীকে বিশেষ অধিকার ও অতিরিক্ত সুযোগ প্রদান করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য যেন নারী সকল অর্থনৈতিক দায়ভার থেকে মুক্ত রেখে পরিবার ও সন্তানদের দুনিয়া ও আখিরাতের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন। কিন্তু যদি কোনো নারী যদি ইসলামের দেওয়া সুবিধাদি গ্রহণ করেন, নিজের ও পরিবারের সকল খরচপত্র স্বামী থেকে আদায় করেন, কিন্তু নিজে পরিবার ও সন্তানদের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত না করে নিজের উচ্ছলতা, স্বাধীনতা ইত্যাদির নামে চাকরী, সমাজ, গল্প ইত্যাদি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন তবে তা নিঃসন্দেহে ভয়ঙ্কর খিয়ানত বলে গণ্য, যেজন্য তাকে দুনিয়ার জীবনের ও আখিরাতে আল্লাহর শাস্তির মুখোমুখি হতে হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্য, কর্ম, চাকরী ইত্যাদির মাধ্যমে অর্থ উপার্জন, সঞ্চয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে নারীদেরকে পুরুষদের সমান অধিকার প্রদান করা হয়েছে। যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও শুধু নারী হওয়ার কারণে তার প্রতি কোনোরূপ বৈষম্য করা হয় নি বা কোনো কর্ম, চাকরী, ব্যবসা তার জন্য নিষিদ্ধ করা হয় নি। ইসলামের বিধানের মধ্যে থেকে নারী প্রকৃতির সাথে সুসমঞ্জস যে কোনো কর্ম তারা করতে পারেন। তবে এক্ষেত্রের অধিকার ও সুযোগের সাম্য নিশ্চিত করা হলেও দায়িত্বের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অধিকার প্রদান করা হয়েছে। পরিবার ও মানব সভ্যতার প্রতি নারীর প্রাকৃতিক দায়িত্ব পালনের সাথে সঙ্গত রক্ষার জন্য নারীকে পারিবারিক জীবনে অর্থনৈতিক দায়িত্ব থেকে মুক্ত করা হয়েছে এবং তার সকল প্রয়োজন মেটাতে তার স্বামীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এজন্য পরিবারের প্রয়োজন ছাড়া চাকরী বা কর্ম করার অর্থ হলো সন্তান ও পরিবারের দায়িত্ব পালনে অবহেলা বা ত্রুটি করা।
চতুর্থ অধিকারঃ রাজনৈতিক অধিকার
অন্যান্য অধিকারের ন্যায় রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও নারীর প্রতি কোনো বৈষম্যমূলক বিধান ইসলাম প্রদান করে নি। রাজনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রে মূল বিষয় দুটি: প্রথমত, রাষ্ট্র পরিচালনায় মতামত ও পরামর্শ পদানের সুযোগ এবং দ্বিতীয়ত রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বিভিন্ন দায়িত্ব পালন। কুরআনুল কারীমে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যে, সকল জাগতিক বিষয়ে পারস্পরিক পরামর্শের ভিত্তিতে কর্ম নির্বাহ করা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও খুলাফায়ে রাশেদীন বিভিন্ন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়, খলীফা নির্বাচন ইত্যাদি বিষয়ে পুরুষদের পাশাপাশি নারীদের পরামর্শও গ্রহণ করতেন। বর্তমান যুগের সার্বজনীন ভোট ব্যবস্থা ছিল না। তবে সামাজিক বা রাষ্ট্রীয় বিষয়ে নারীদের পরামর্শ নেওয়া হতো। এ সকল বিষয়ে নারীদের ভােট, পরামর্শ বা মত প্রদানের অধিকার নেই এরূপ কোনো চিন্তা কখনোই ছিল না।
কোন নারীকে রাষ্ট্র পরিচালনার বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের একক ক্ষমতা প্রদান করার বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন:
لَنْ يُفْلِحَ قَوْمٌ وَلَوْا أَمْرَهُمْ اِمْرَأةً
যে জনগোষ্ঠী তাদের দায়িত্ব কোনাে নারীর উপর অর্পন করে তারা সফল হয় না । (সহীহ্ বুখারী) এ হাদীসের আলোকে কোনাে কোনাে ইমাম ও ফকীহ্ মত প্রকাশ করেছেন যে, নারী রাষ্ট্র প্রধান বা বিচারকের দায়িত্ব গ্রহন করতে পারবে না। কিন্তু অন্যান্য ইমাম ও ফকীহ্ মত প্রকাশ করেছেন যে, কেবলমাত্র নারীকে স্বৈরতান্ত্রিক বা একচ্ছত্র ক্ষমতা প্রদান আপত্তিকর, কিন্তু পরামর্শ ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নারীর রাষ্ট্রপ্রধান হওয়া আপত্তিকর নয়। এছাড়া মন্ত্রী, বিচারক ও অন্যান্য সকল দায়িত্বও তারা গ্রহণ করতে পারবেন তারা বলেন, কুরআনে নারী শাসককে প্রশংসা করা হয়েছে। নবী সুলাইমান (আ)-এর সাথে ইয়ামানের সব অঞ্চলের রাণী আলােচনায় উক্ত রাণীর (বিলকীস) প্রজ্ঞা ও শাসনের প্রশংসা করা হয়েছে এবং প্রসঙ্গত উল্লেখ করা হয়েছে, উক্ত রাণী পরিষদের পরামর্শ ছাড়া কোনাে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন না।
শুধু আইন করে, বিচার করে, কোনো নারীকে ধরে মন্ত্রী বানিয়ে, বা কোটার মাধ্যমে কিছু নারীকে চাকরী দিয়ে সমাজে নারী প্রতি বৈষম্য রোধ করা যায় না। বৈষম্য দূর করা ও অধিকার প্রতিষ্ঠা করার জন্য এ বিষয়ে ইসলামের নির্দেশ, নারীর অধিকার,কন্যা, স্ত্রী ও মাতার অধিকার অধিকার প্রতিষ্ঠা করলে মহান আল্লাহর নিকট দুনিয়া ও আখিরাতে যে মহান পুরস্কার রয়েছে এবং এ বিষয়ে অবহেলা করলে যে কঠিন শাস্তি রয়েছে সে বিষয়ে সচেতনতা তৈরি করা নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করার অন্যতম উপায়।
নারীবাদিতা, পুরুষতান্ত্রিকতা, স্ত্রীর অত্যাচার, স্বামীর অত্যাচার ইত্যাদি বিভিন্ন বক্তব্য দিয়ে বিচ্ছিন্নতা তৈরি নয়, আমাদের মূল দায়িত্ব হলো, অধিকার ও দায়িত্ববােধের মধ্যে সমন্বয় সাধন করা। বিশেষত নারীত্বের কারণে নারীর প্রতি বৈষম্য, দৈহিক বা সামাজিক দুর্বলতার কারণে যেন নারী কখনো বৈষম্যের শিকার না হন তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি নারী অধিকারের দোহাই দিয়ে নারীকে তার প্রকৃতির বিরুদ্ধ কাজে লিপ্ত করা, নারীকে তার প্রকৃতি নির্ধারিত কর্ম করতে নিরুৎসাহিত করা ইত্যাদি মানবতা বিধবংসী প্রবণতা রোধ করতে হবে। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাওফীক প্রদান করুন। আ-মী-ন।
Visit Our English Site : Click Here
Thanks for reading. جزاك الله خيرا